ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ ও ক্ষমতা থেকে সরানোর ঘটনায় বিশ্বজুড়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে— এরপর কি তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য এখন ইরান? নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠকের পর ইরানের বিরুদ্ধে নতুন হুঁশিয়ারি, সরকার পরিবর্তনের ইঙ্গিত এবং ট্রাম্পের কঠোর অবস্থান সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সংঘাতের সংকেত দেখছেন বিশ্লেষকরা। তাদের আশঙ্কা, ভেনেজুয়েলায় ‘অবৈধ শক্তি প্রয়োগের’ ঘটনা ইরানকে ঘিরে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করার বিপদ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা জানাচ্ছে, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণের কিছুক্ষণ আগে ইসরায়েলি রাজনীতিক ইয়াইর লাপিদ তেহরানকে সতর্ক করে বলেন, ‘‘ভেনেজুয়েলায় যা ঘটছে, ইরানের শাসকদের তাই খুব ভালো করে দেখার প্রয়োজন।’’’ এর আগে, কয়েক দিন আগে সরাসরি বলপ্রয়োগে ক্ষমতা থেকে সরানোর আগে ইসরায়েলের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠকে বসে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন হামলার হুমকি ও সরকার বদলের পরিকল্পনা ঘোষণা করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
বিশ্লেষকদের মতে, কারাকাস ও তেহরান— দুই স্থানেই যুক্তরাষ্ট্রের টানাপোড়েন থাকলেও, মাদুরোর বিরুদ্ধে ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ ইরানের সঙ্গে নতুন যুদ্ধের ঝুঁকি আরও বাড়িয়েছে। ন্যাশনাল ইরানি অ্যামেরিকান কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট জামাল আবদি বলেন, ‘‘নতুন এই অনিয়ম পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে তুলছে, যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়িয়ে দিচ্ছে। ট্রাম্প যদি সরকার পরিবর্তনের জন্য ‘শল্যচিকিৎসা’ করে রাজনীতিকে বদলে দেন বা ইসরায়েলকে একই ধরনের পদক্ষেপ চালাতে উৎসাহিত করেন, তাহলে যারা ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ চায়, তারাও আরও উদ্দীপ্ত হবে।’’
তিনি আরও বলেন, মাদুরোকে সরানোর ঘটনা ইরানকে এমন পরিস্থিতিতে ফেলতে পারে যেখানে তারা সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করতে বা আগাম আক্রমণ চালাতে বাধ্য হয়। সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির জ্যেষ্ঠ গবেষক নেগার মারতাজাভিও জানান, ‘‘ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকায় ট্রাম্পের লক্ষ্য অনেকটাই কঠোর; ফলে কূটনীতির দরজা ধুকধুক করে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তারা তেহরান থেকে শুনতে পাচ্ছে— যুক্তরাষ্ট্র এমন আলোচনা চায় না যেখানে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ চাই। এর ফলে আলোচনা কমে যাচ্ছে আর সংঘাতের সম্ভাবনাই বেশি।’’
আবদি মনে করিয়ে দেন, এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য নিয়ে সব সন্দেহ আরও জোরালো করেছে— ইরানের ভেতর যারা বলে, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কথা বলে লাভ নেই, পারমাণবিক প্রতিরোধই বর্তমান অভ্যুত্থানের মূল মন্ত্র’— তাদের যুক্তি আরও শক্তিশালী হচ্ছে।
ইরান-ভেনেজুয়েলা সম্পর্ক
মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়ার অসামান্য অভিযানের আগে থেকে কয়েক মাস ধরে ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলা নিয়ে মনোভাব ছিল আক্রমণাত্মক। ওয়াশিংটন অভিযোগ তোলে মাদুরোর বিরুদ্ধে, তিনি মাদক চক্র পরিচালনা করছেন ও দেশের বিশাল তেলের সম্পদে ওয়াশিংটনের দাবি রয়েছে—এমনই আভাস দেয়। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী মার্কো রুবিও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বারবার ইরান ও মাদুরোর সম্পর্কের কথাও তুলে ধরেছেন। এমনকি, প্রমাণ ছাড়াই অভিযোগ করেন, কারাকাস লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে আশ্রয় দেয়। আসলে, মাদুরো ছিলেন ইরানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। দু’পক্ষই কঠোর নিষেধাজ্ঞার মুখে নিজেদের বাণিজ্য ও সম্পর্ক বাড়ানোর চেষ্টা করেছে, যার পরিমাণ কয়েক বিলিয়ন ডলার।
ফলে, মাদুরো থাকলে ইরানির ছোট এই মিত্র জোটের অধঃপতন আরও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এসহ সিরিয়ায় প্রেসিডেন্ট আসাদ ও লেবাননে হিজবুল্লাহর দুর্বল হয়ে যাওয়া নতুন করে স্পষ্ট হচ্ছে।
ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পরে দ্রুতই ইরান নিন্দা জানায় এবং জাতিসংঘের হস্তক্ষেপের আহ্বান জানায়। তেহরানের ভাষায়, এটি সুনির্দিষ্ট একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আক্রমণ, যা আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক এবং জাতিসংঘের আদেশবিরোধী।
শনিবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও বলেন, ‘‘মাদুরোকে ধরে আনার ঘটনার মাধ্যমে আমেরিকা নিজেদের শক্তির পরিচয় দিয়েছে।’’ অন্যদিকে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ি মন্তব্য করেন, ‘‘আমরা কখনোই আত্মসমর্পণ করব না, বরং শত্রুদের বারবার বুঝিয়ে দেবো যে, তারা আমাদের হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য করবে।’’’
ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি
একই সময়ে, ট্রাম্প গত সপ্তাহে ফ্লোরিডায় নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠকে ইরানকে কঠোর হুঁশিয়ারি দেন, বলেন, ‘‘যদি ইরান ক্ষেপণাস্ত্র বা পারমাণবিক কর্মসূচি গড়ে তোলে, তবে তা গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে।’’ এর আগে, জুনে ইসরায়েল ইরানের ভূখণ্ডে হামলা চালিয়ে যুদ্ধ শুরু করেছিল। ১২ দিন ধরে চলা সেই যুদ্ধে ইরানের শীর্ষ সেনা কর্মকর্তা, কয়েকজন পারমাণবিক বিজ্ঞানী ও অসংখ্য বেসামরিক নিহত হয়। এরপর, যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের তিনটি প্রধান পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়।
এই হামলার পর ট্রাম্প দাবি করেন, ‘‘ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে।’’ কিন্তু ইরান টিকে যায়, পাল্টা রকেট হামলায় ইসরায়েলের বেশ কিছু অবকাঠামো আঘাত হানে। অবশেষে দীর্ঘ ১২ দিনের যুদ্ধ বিরতি ঘটে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই হামলার মূল লক্ষ্য ছিল ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হটকারি ভাব দেখিয়ে ইরানে সরকার পরিবর্তন, যা এখনো অব্যাহত। ট্রাম্পও রেহাই দেননি ইরানের চলমান বিক্ষোভকে, বলেন, ‘‘ইরানি বিক্ষোভকারীদের ক্ষতি হলে কঠোর জবাব দেওয়া হবে।’’
এ অবস্থায়, ভেনেজুয়েলার মতো করে ইরানের সরকার পতনের জন্য কি কোনো অভিযান চালানো যাবে? এটি এখন প্রশ্ন। তবে, আবদি মনে করিয়ে দেন, ইসরায়েল ইতোমধ্যে ইরানের শীর্ষ নেতাদের হত্যার চেষ্টা করেছে, ট্রাম্পও কৌশলে খামেনেয়িকে হত্যার হুমকি দিয়েছেন। তবে, ইরান এমন ব্যবস্থা নিয়েছে যাতে করে কোনোরকম নেতা নিহত হলেও শাসনব্যবস্থা অচল না হয়। এর ফলে, এই ধরনের অভিযান আরও জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
মাদুরো-পরবর্তী ভেনেজুয়েলা
মাদুরোকে সরালেও ভেনেজুয়েলার শাসনব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে যায়নি। আধিকারিক ডেলসি রদ্রিগেস বলেন, দেশটির বৈধ প্রেসিডেন্ট এখনও মাদুরোই। তিনি মার্কিন হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে, ইসরায়েলের সংশ্লিষ্টতা ধরে নিয়েছেন। ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দেন, ‘‘রদ্রিগেস যদি মার্কিন দাবির সঙ্গে সায় না দেন, তবে তাকে ‘মাদুরোর চেয়েও বড় মূল্য’ দিতে হতে পারে।’’’
বিশ্লেষকদের মতে, ভেনেজুয়েলায় মার্কিন পরিকল্পনা এখন তাড়াতাড়ি শেষ হবে না। আরও কঠিন সামরিক পদক্ষেপের প্রয়োজন হতে পারে, যদিও মার্কিন জনগণ দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের জন্য তৈরি নয়। ট্রাম্প এমনকি ভেনেজুয়েলায় স্থল অভিযান চালানোর কথাও ভাবছেন।
আবদি সতর্ক করে দেন, যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তবে বিশ্বের অন্য যেকোনো যুদ্ধের মতোই ইরানের সঙ্গে নতুন সংঘর্ষ হতে পারে, যেমনটি হয়েছিল ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধে।
তেল নিয়েই মূল খেলাটি
বিশাল অংশ বিশ্লেষকদের মতে, ভেনেজুয়েলার তেলের নিয়ন্ত্রণ পেলে ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধের ব্যাপারেও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ, বিশ্ববাজারে প্রায় ২০ শতাংশ তেল হরমুজ প্রণালী দিয়ে যায়, যুদ্ধ হলে ইরান এই পথ বন্ধ করে দিতে পারে।
আবদি মনে করেন, যদিও ভেনেজুয়েলার তেল নিরাপদ মনে হলেও, তার জন্য অনেক কিছুই নিখুঁতভাবে করতে হবে—এখন এই পরিস্থিতিতে তা কঠিন। সরকারিভাবে এ নিয়ে এখনই সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় নয়।

