প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেছেন, গণভোট অন্য সব সাধারণ নির্বাচনের মতোই হবে, তবে এর মাধ্যমে জনগণ নিজেদের ভবিষ্যত নির্ধারণ করবে। তিনি উল্লেখ করেন, এই গণভোটের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো ভবিষ্যতে যারা দেশ পরিচালনা করবেন, তারা যেন কখনোই ফ্যাসিস্ট মনোভাব বা স্বেচ্ছাচারিতায় জড়িয়ে পড়তে না পারেন। এ জন্য আজকের এই ভোট গুরুত্বপূর্ণ।
আজ বৃহস্পতিবার ঢাকায় এনজিওবিষয়ক ব্যুরোর সম্মেলন কক্ষে ‘আসন্ন গণভোট এবং এনজিওসমূহের করণীয়’ শীর্ষক কর্মশালায় প্রধান আলোচকের বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন। সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মহাপরিচালক মো. দাউদ মিয়া এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার সহকারী মনির হায়দার ও সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের নিবন্ধিত স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক প্রায় সাড়ে চার হাজার এনজিওর প্রতিনিধিরা এই কর্মশালায় অংশগ্রহণ করেন।
আলী রীয়াজ বলেন, সামনে যে গণভোট আসছে, সেটি যথাযথভাবে সম্পন্ন হবে। তিনি ব্যাখ্যা করেন, দেশের সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো যদি ত্রুটিপূর্ণ থাকে, তাহলে সরকারি কর্মকর্তা ও নেতৃত্বরা ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠার সুযোগ পান। এ জন্যই এই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের গুরুত্ব তুলে ধরেন। এর মাধ্যমে এই ধরনের অবাধ্যতা আর মানসিকতা রুখে দেওয়া সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, গণভোট কী এবং কেন জরুরি—এ নিয়ে কোনো সংশয় নেই। এটি সাধারণ নির্বাচন মতই হবে, তবে ফলাফল সরাসরি সিদ্ধান্তকে নির্ধারণ করবে কিভাবে বাংলাদেশ আগামীর দিনগুলো চলবে। নির্বাচনে ভোটাররা দুটি ব্যালট পাবেন, যার মধ্যে একটির রঙিন ও অন্যটি সাদা। রঙিন ব্যালটটি সাধারণ নির্বাচনের জন্য, আর সাদা ব্যালটটি গণভোটের জন্য।
আলী রীয়াজ আরও বলেন, এই গণভোটের মাধ্যমে দেশের জনগণের মতামত তুলে ধরা হবে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া, নিপীড়িত-নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর আত্মোৎসর্গী নেতৃত্ব এই দায়িত্ব আমাদের দিয়েছেন। একারণে নিজের দায়িত্ববোধ থেকে গণভোটের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে হবে।
তিনি উল্লেখ করেন, রাষ্ট্রের সব স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব একটি বড় সংকট। এ কারণেই গণভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রের সম্মতির ভিত্তিতে জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন হলে স্বচ্ছতা অর্জিত হবে আরও সহজভাবে।
আলী রীয়াজ দেশের স্বাধীনতা পুনর্গঠন, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর উন্নয়নসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও সংকটে এনজিও ও উন্নয়নকর্মীদের অবদান স্মরণ করে বলেন, এ প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর মানুষ আস্থা রাখে, তাই আপনাদের দায়িত্বপ্রাপ্ত হতে হবে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে। প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষদের বোঝানোর মাধ্যমে গণভোটের গুরুত্ব ও উদ্দেশ্য তুলে ধরতে পারলে দেশের বৃহৎ অংশের মধ্যে সচেতনতা বাড়বে।
বিশেষ আলোচক মনির হায়দার বলেন, পাকিস্তানি শাসনামলে আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকার অনেকাংশে হরণ করা হয়েছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্ন ছিল একটি স্বচ্ছ, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার। যদি গণভোটের মাধ্যমে আমরা কাঙ্ক্ষিত সংস্কার সম্ভব করতে পারি, তাহলে ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ দেশ নির্মাণের পথ সুগম হবে। অন্যথায়, দেশ আবার পুরনো অবস্থায় ফিরে যাবার আশঙ্কাও রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, যদি জনগণ হ্যাঁ ভোট দেয়, তাহলে কার্যকর সংসদীয় ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। এতে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা হবে, বিচার বিভাগ সংস্কার পাবে, দেশ পরিচালনা আরও জবাবদিহিপূর্ণ ও স্বচ্ছ হবে।
সুজনের সাবেক প্রধান সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, জুলাই জাতীয় সনদে উল্লিখিত সংস্কারগুলো সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের ভিত্তিতে আসছে। তিনি ব্যাখ্যা করেন, গণভোটের মাধ্যমে দেশের ভবিষ্যত পরিচালনায় জনগণের মতামত নেওয়া হবে, যা সবার অংশগ্রহণে এক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এই প্রক্রিয়াকে সফল করতে বিভিন্ন এনজিওের প্রতিনিধিরা দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করবে বলে আশা প্রকাশ করেন।
সভায় উপস্থিত এনজিওসমূহের প্রায় ৫০ থেকে ৬০ লাখ প্রত্যক্ষ উপকারভোগী, তাদের পরিবার ও পরোক্ষ উপকারভোগীদের মধ্যে গণভোটের বিষয়টি জনপ্রিয় ও কার্যকরভাবে বেগবান করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। মহাপরিচালক মো. দাউদ মিয়া নিশ্চিত করেন, এনজিও ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো এই কাজের জন্য প্রস্তুত।
