ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সুনামগঞ্জের প্রবাসী অধ্যুষিত গুরুত্বপূর্ণ আসন সুনামগঞ্জ-৩ এখন রাজনৈতিক রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। জগন্নাথপুর ও শান্তিগঞ্জ উপজেলার সমন্বয়ে গঠিত এই আসনটিতে বিএনপি, আমার বাংলাদেশ (এবি পার্টি) ও খেলাফত মজলিসের পাশাপাশি কয়েকজন স্বতন্ত্র প্রার্থীও মাঠে সক্রিয় হয়ে তুলোধোনা তৈরি করেছেন। প্রতীক বরাদ্দের আগ থেকেই এলাকায় প্রচারণা তুঙ্গে—গণসংযোগ, উঠান বৈঠক ও দরজায় দরজায় যোগাযোগ চলছে।
সবচেয়ে নমনীয় মূল প্রশ্নটি একই: শেষ পর্যন্ত আসনটি দখলে রাখবে কে—ধানের শীষ, ঈগল নাকি তালা? তবে বাস্তবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তাৎপর্যপূর্ণ ও বহুমুখী।
ভূখণ্ড ও সমস্যা: জগন্নাথপুর-শান্তিগঞ্জ দুটি উপজেলার সমন্বয়ে গঠিত সুনামগঞ্জ-৩ সুনামগঞ্জ জেলার অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। এখানে শ্রমজীবী, মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের সংখ্যা বেশি। স্থানীয়দের প্রধান উদ্বেগের বিষয়গুলো—বন্যা ও জলাবদ্ধতা, ভাঙা সড়ক ও দুর্বল ড্রেনেজ, মাদক প্রবণতা এবং মশার উপদ্রব। এসব সমস্যা সমাধানে প্রতিশ্রুতির ওপরেই ভোটারদের মন টিকে থাকবে বলে স্থানীয়দের জানান।
বিএনপি প্রার্থী কয়ছর এম. আহমদ (ধানের শীষ) রাজনৈতিকভাবে শক্ত থাকা একজন নেতা। যুক্তরাজ্য বিএনপিতে তৎকালীন সময়ে নিয়মিত দায়িত্বে ছিলেন এবং কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটিতেও ছিলেন। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এটি তার প্রথম নির্বাচন, তবু দলীয় সাংগঠনিক শক্তি কাজে লাগিয়ে ভোটের মাঠে তিনি দ্রুতই পা মেলান। তফসিল ঘোষণা হওয়ার আগেই তিনি সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে ভোটারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াচ্ছেন, দোয়া-মাহফিল, মতবিনিময় ও গণসংযোগে এলাকার দাবি-বিচার শুনছেন এবং দ্রুত উন্নয়নের আশ্বাস দিচ্ছেন। কয়ছর এম. আহমদের ভাষ্য, সুনামগঞ্জ-৩ মানুষ শান্তি, নিরাপত্তা ও বসবাসের মানোন্নয়ন চায়—রাস্তা-ঘাট, ড্রেনেজ, বন্যা মোকাবিলা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে কাজ করবেন তিনি। স্থানীয় বিএনপি নেতারা মনে করেন দলের ঐতিহ্যগত ভোটব্যাংক শক্তিশালী; ফলকে তারা আশা দেখাচ্ছেন।
আমার বাংলাদেশ (এবি পার্টি) মনোনীত সৈয়দ তালহা আলম (ঈগল) নিজেকে ব্যক্তি হিসেবে সুসংগঠিত প্রার্থী দাবি করছেন। ব্যবসায়ীর পেশায় থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে সংগঠনিক রাজনীতিতে সক্রিয় তিনি। স্থানীয় সংগঠন গড়ে তোলার পাশাপাশি মাঠে নেমে ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলছেন—নারী-পুরুষ, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছেন বলে তার বক্তব্য। তালহা আলম এলাকার প্রত্যেক ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে কার্যক্রম জোরদারে আস্থা প্রকাশ করেছেন এবং সুষ্ঠু নির্বাচন হলে এবি পার্টি ভালো করবেন বলে আশাবাদী।
বিএনপির বহিষ্কৃত এক প্রার্থী ব্যারিস্টার আনোয়ার হোসেন (তালা প্রতীক) স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে আছেন। তিনি অভিযোগ করেন, মানুষ গত নির্বাচনের প্রতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার থেকে বিরক্ত—এবার তারা বিকল্প খুঁজছেন। ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র ও কল্যাণমুখী নীতির প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি মাদক, গ্যাস সংকট, মশা ও জলাবদ্ধতা সমাধানে কাজ করার অঙ্গীকার করছেন।
জামায়াত উত্তীর্ণ পথ দিয়ে খেলাফত মজলিসে যোগ দেয়া সাবেক সংসদ সদস্য আইনজীবী শাহীনূর পাশা চৌধুরী (রিকশা প্রতীক) দলের কেন্দ্রীয় পদে আছেন এবং তহবিলে মাঠে সক্রিয়। তার রাজনৈতিক জীবন দীর্ঘ—জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম থেকে শুরু করে তৃণমূলে আওয়ামী বিরোধী অবস্থান, পরে খেলাফতে যোগ—এখন পুনরায় নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে তিনি নিজেদের প্রভাব প্রদর্শন করার চেষ্টা করছেন। গত নির্বাচনী অভিজ্ঞতা ও স্থানীয় পরিচিতি তাকে একটি নির্দিষ্ট ভোটক্ষেত্রে বলপূর্ণ করে রেখেছে।
এ ছাড়া কয়েকজন স্বতন্ত্র ও দলীয় প্রার্থীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে। নির্বাচনে নামানুসারে তালিকায় রয়েছেন—বিএনপি মনোনীত মো. কয়ছর এম. আহমদ (ধানের শীষ), খেলাফত মজলিস মনোনীত মো. শাহীনূর পাশা চৌধুরী (রিকশা), স্বতন্ত্র (মনোনয়ন বঞ্চিত বিএনপি বিদ্রোহী) মো. আনোয়ার হোসেন (তালা), স্বতন্ত্র মো. মাহফুজুর রহমান খালেদ (তুষার) (টেবিল ঘড়ি), খেলাফত মজলিস মনোনীত শেখ মুশতাক আহমদ (দেওয়াল ঘড়ি), আমার বাংলাদেশ পার্টির সৈয়দ তালহা আলম (ঈগল) ও স্বতন্ত্র হুসাইন আহমেদ (ফুটবল)।
এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩,৪৪,৬৫৩ জন; পুরুষ ভোটার ১,৭৩,৭২৮ জন, নারী ভোটার ১,৭০,৯২১ জন ও তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ৪ জন। নির্বাচনী প্রচারণার আনুষ্ঠানিক সময় শুরু হয়েছে ২২ জানুয়ারি থেকে এবং ভোটগ্রহণ নির্ধারিত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে।
স্থানীয়রা বলছেন—তারা চান সৎ, যোগ্য ও কর্মক্ষম প্রতিনিধিকে ভোট দিয়ে দীর্ঘদিনের সমস্যার বাস্তবসম্মত সমাধান দেখতে। শান্তি, নিরাপত্তা ও দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশই তাদের মুখ্য দাবি। এখন দেখার বিষয়, নির্দিষ্ট প্রতিজ্ঞা ও মাঠের গণসংযোগের ভিত্তিতে শেষ পর্যন্ত কারা ভোটারের মন জিততে পারেন—ধানের শীষ, ঈগল নাকি তালা।

