দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ভারত–ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) শিগগিরই চূড়ান্ত ঘোষণা হতে পারে—এমন ইঙ্গিত মিলেছে। সংশ্লিষ্ট সরকারি সূত্রকে উদ্ধৃত করে রয়টার্স জানিয়েছে, ওই চুক্তি চূড়ান্ত হলে ইউরোপীয় গাড়ি ও মদের উপর আমদানি শুল্ক উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে এবং বিনিময়ে ভারতের তৈরি পোশাক, গয়না, ইলেকট্রনিক্স ও রাসায়নিক পণ্যগুলির জন্য ইউরোপের বিশাল বাজার উন্মুক্ত হবে।
উল্লেখ করা হচ্ছে, ২৫–২৮ জানুয়ারি ইউরোপীয় প্রতিনিধিদলের ভারতের সফরের সময়—বিশেষত দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে—মঙ্গলবার (২৩ জানুয়ারি নয়, করণীয় তারিখ অনুসারে) চূড়ান্ত ঘোষণার পণ্ডিততা হতে পারে। এই সফরে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েনসহ উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠকে বসবেন বলে জানা গেছে। চুক্তি কার্যকর হলে দুই পক্ষের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাণিজ্যিক সুবিধার পাশাপাশি নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষায় সহযোগিতার ক্ষেত্রেও অগ্রগতির সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। সূত্রের বরাতে বলা হচ্ছে, একটি নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা চুক্তিতেও স্বাক্ষরের প্রস্তাব রয়েছে—যা বাস্তবায়িত হলে এশিয়ার মধ্যে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার পর ভারত ইইউর তৃতীয় এই ধরনের অংশীদার হতে পারে। এছাড়া উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী ও শিক্ষার্থীদের চলাচলের সুবিধা নিশ্চিত করতে একটি ‘মবিলিটি এগ্রিমেন্ট’ স্বাক্ষরের কথাও আলোচনায় রয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারত-ইইউ দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৩৬.৫ বিলিয়ন ডলার; এই পরিসংখ্যানই ইইউকে ভারতের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে তুলে ধরে। তবে কোনও চুক্তিই চূড়ান্তভাবে কার্যকর হওয়ার জন্য ইইউ পার্লামেন্টের অনুমোদন লাগবে, এবং সেই প্রক্রিয়ায় সাধারণত আরও অন্তত এক বছর সময় লাগতে পারে বলে বিশ্লেষকরা বলছেন।
রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক প্রেক্ষাপটে এই চুক্তির গুরুত্ব বড়—বিশেষত এমন সময়ে যখন বিভিন্ন বড় অর্থনীতিতে শুল্কবৃদ্ধি বা প্রতিরোধী নীতির ঝুঁকি রয়েছে। এসব অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে ভারত বিকল্প বাজার ও শক্তিশালী বাণিজ্য অংশীদারের সন্ধান করছে, এবং এই চুক্তি সেই দিক থেকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে উরসুলা ফন ডার লিয়েনের মন্তব্য অনুযায়ী, চুক্তিটি শেষ পর্যায়ে থাকলেও কিছু স্পর্শকাতর বিষয় এখনও আলোচ্য। এর মধ্যে বিশেষত ভারতের উচ্চ গাড়ি আমদানির শুল্ক হ্রাস সংক্রান্ত দরকষাকষি গুরুত্বপূর্ণ—যদি শুল্ক কমে, তাহলে ফক্সওয়াগন, রেনল্টের মতো ইউরোপীয় নির্মাতারা ভারতের বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠতে পারবে।
কিন্তু সমানভাবে উদ্বেগ রয়েছে ‘নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার’ বা অন_tariff প্রতিবন্ধকতার দিকেও। ইইউর নতুন কার্বন বর্জ্য-ভিত্তিক কর (কার্বন বেসড নীতি) ও কিছু ক্ষেত্রে জিএসপি সুবিধা প্রত্যাহারের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে নয়াদিল্লি সতর্ক। ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আশঙ্কা করেছে যে নির্দিষ্ট সুবিধা স্থগিত হলে কয়েকটি খাতের রফতানিতে প্রভাব পড়তে পারে এবং প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী তার পরিমাণ কয়েকশ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
হতে পারে এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে ভারতীয় তৈরি পোশাক, চামড়াজাত ও অন্য কিছু মানসম্মত পণ্য রপ্তানি বাড়বে—এমনটাই মনে করেন বিশ্লেষকরা। দিল্লির থিঙ্ক ট্যাঙ্ক গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ (GTRI)-এর প্রতিষ্ঠাতা অজয় শ্রীবাস্তব বলছেন, এই চুক্তি ভারতের রপ্তানি প্রতিযোগিতা বাড়াতে সাহায্য করবে এবং বাংলাদেশ, ভিয়েতনামসহ প্রতিবেশী রপ্তানিকারক দেশগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিতে সক্ষম করবে।
সামগ্রিকভাবে, চুক্তির সুবিধা ও ঝুঁকি—উভয়ই রয়েছে। কর, প্রবেশব্যবস্থা ও পরিবেশগত মানদণ্ড নিয়ে এখনো দরকষাকষি চলমান; সেইসব সমস্যা সমাধান হলে এফটিএ দুই পক্ষের জন্যই গেমচেঞ্জার হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র: রয়টার্স
