আল জাজিরার সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বললেন, দলের প্রধান (আমির) পদে কোনো নারী কখনো দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। তিনি এ সিদ্ধান্তকে ‘ঈশ্বরপ্রদত্ত সৃষ্টিগত পার্থক্য’ হিসেবে ব্যাখ্যা করে বলেন, নারীর স্বকীয়তা ও পুরুষ-নারীর মধ্যে আলাদা ভূমিকাকে বদলানো যাবে না। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন আলজাজিরার সাংবাদিক শ্রীনিবাসন জৈন; এতে দলীয় নীতি, নারী-নেতৃত্ব, সংখ্যালঘু সুরক্ষা, ১৯৭১ সংক্রান্ত বিতর্ক, ভারত সম্পর্ক ইত্যাদি বিষয়ে দলের অবস্থান তুলে ধরা হয়।
সীমাবদ্ধতা নয়, সম্মান দেখানোর দাবি
শফিকুর রহমান বলেন, তিনি নারীদের সম্মান করেন এবং ভবিষ্যতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে দল। তবে তিনি বলেন, কিছুক্ষেত্রে পারিবারিক দায়িত্ব—বিশেষ করে মাতৃত্ব ও স্তন্যদানকাল—নারীদের ওপর এমন দায়িত্ব আরোপ করে যা দলের শীর্ষস্থানে পূর্ণকালীন নেতৃত্ব দেওয়ার সঙ্গে মিলবে না। তিনি দাবি করেন, এই কারণে দলে এই মুহূর্তে কোনো নারীকে সংসদীয় নির্বাচনে প্রার্থী করা হয়নি, কিন্তু স্থানীয় নির্বাচনে নারী প্রতিদ্বন্দ্বী রেখেছে এবং ভবিষ্যতে আরও প্রস্তুতি দেবে।
ইসলামি আইন সম্পর্কে পরোক্ষ অবস্থান
প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ইসলামী আইন চালুর বিষয়টি নির্ধারণ করবে সংসদ—যদি তা দেশের উন্নতির জন্য অপরিহার্য বলে মনে করা হয়। নিজেরা ভোটে অংশ নেবেন বর্তমান ব্যবস্থার অধীনে এবং জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু করবেন না, জোর দিয়ে বলেছেন তিনি।
কর্মঘণ্টা ও মাতৃত্বকালীন সুযোগ
মাতৃত্বকালীন সুবিধা সম্পর্কিত বিতর্ক প্রসঙ্গে শফিকুর রহমান বলেন, তিনি কখনও নারীদের কর্মঘণ্টা হঠাৎ কমানোর কোনও ‘অব্যাহতিপূর্ণ’ প্রস্তাব দেননি; বরং তিনি বলেছেন যে মাতৃত্বকালীন সময়ে মহিলাদের প্রতি সম্মান দেখানো উচিত এবং বর্তমানে ছয় মাসের ছুটি যথেষ্ট নয়—শিশু বেড়ে ওঠার জন্য বেশি সময় দরকার। তিনি দাবি করেন, পোশাকশিল্প পরিদর্শনে কর্মী নারীরা এই দৃষ্টিভঙ্গিকে স্বস্তিকর মনে করেছেন।
ছাত্রশিবির ও মিডিয়া-সাংস্কৃতিক প্রশ্ন
আল জাজিরার প্রতিবেদনে ছাত্রনেতাদের আক্রমণাত্মক বক্তব্য এবং কিছু সাংস্কৃতিক/সংবাদমাধ্যম বন্ধের ডাকের বিষয়ে কথা উঠে আসে। শফিকুর রহমান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এসব উস্কানিমূলক বক্তব্য দলের আনুষ্ঠানিক অবস্থান নয়; তারা নিন্দা জানায় এবং এ ধরনের কোনো সমর্থন করেনি। তিনি বলেন যে ইসলামী ছাত্রশিবির একটি আলাদা সংগঠন এবং সেখানে ব্যবস্থা গ্রহণ ছাত্রশিবিরের কাজ।
সংখ্যালঘু নিরাপত্তা ও ১৯৭১সম্বন্ধীয় বিতর্ক
সংখ্যালঘুদের ওপর অতীত হামলার অভিযোগ ও ১৯৭১ সালের সামগ্রিক প্রসঙ্গে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন করা হলে শাফিকুর রহমান তা প্রত্যাখ্যান বা প্রশ্নবিদ্ধ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, জামায়াত কখনও গণহিন্দুদের বিরুদ্ধে সংগঠিত হামলার সঙ্গে জড়িত ছিলেন না এবং যুদ্ধাপরাধের মামলাগুলো রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত ও বিতর্কিত ছিল। একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন যে মানুষ ভুল করতে পারে এবং ১৯৪৭ সালের পর যদি জামায়াত বা কেউ কষ্ট দিলে তিনি নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছেন—কিন্তু নৃশংসতা ও ভুলের মধ্যে পার্থক্য রাখেন তিনি।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক: সংলাপ ও ভ্রাতৃত্ব
শফিকুর রহমান বলেন, ভারত আমাদের প্রতিবেশী এবং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক হবে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে। শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি যদি দ্বিপক্ষীয়ভাবে সমাধান না হয়, তিনি বলেন, সংলাপ বাড়িয়ে বিষয়টি মীমাংসা করা হবে—আগ্রাসনের কোনো মনোভাব নেই। তিনি দাবি করেন, জামায়াত কোনও নির্দিষ্ট দেশের পক্ষ নেই এবং সবাইকে সঙ্গে নিয়ে ন্যায়সংগত সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়।
তরুণদের প্রত্যাশা ও দলের ভবিষ্যৎ
সবশেষে, তরুণ প্রজন্মের পরিবর্তন প্রত্যাশা সম্পর্কে প্রশ্নে তিনি বলেন, জনগণই শেষ সিদ্ধান্ত নেবে। দলের তরুণ-সমর্থকদের মধ্যেও ব্যাপক সচেতনতা দেখা যাচ্ছে—কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদে ইসলামী ছাত্রশিবিরের পক্ষে ভোট পড়েছে, যা তাদের মতে তরুণদের আকাঙ্ক্ষাকে প্রতিফলিত করে। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন যে দল তরুণ ও নারীদের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে দেশকে উন্নতির দিকে নিয়ে যাবে।
সাক্ষাৎকারটির বিভিন্ন দিক—নারীর ভূমিকা, ধর্মীয় নীতি, ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক—নিয়ে তীব্র বিতর্ক ও প্রশ্নোত্তর হয়েছে। শফিকুর রহমানের বক্তব্যসমূহ দেশজুড়ে স্বতন্ত্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

