বিশ বছর আগে, ২০০৫ সালের শেষদিকে নকীব খান, কুমার বিশ্বজিৎ, আসিফ ইকবাল ও রেজা রহমানের হাত ধরে যাত্রা শুরু করে গানচিল। শুক্রবার রাজধানীর গুলশান ক্লাবের ক্রিস্টাল প্যালেস হল যেন সেই যাত্রারই এক সোনালি অধ্যায়ে ফিরে গেল—গানচিলের দুই দশক পূর্তির উৎসবে প্রতিটি কোণা ভরে উঠেছিল স্মৃতি, সুর এবং আবেগে।
নব্বই দশক থেকে দুই হাজারের দশক ও আজকের সময় পর্যন্ত কণ্ঠশিল্পী, সুরকার, গীতিকার ও সংগীতের নেপথ্যের মানুষদের এক মিলনমেলায় সাংস্কৃতিক পরিবেশনা হয়ে উঠেছিল অনুষ্ঠানের প্রধান আকর্ষণ। অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশটির অন্যতম প্রখ্যাত সংগীত প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান গানচিলের এই দীর্ঘ পথচলা উদযাপন করা।
এই দিন শুধু পুরনো কর্মকাণ্ড স্মরণ করা হয় না—ছিল ভবিষ্যৎ নকশার ঘোষণা। গানচিল নতুন লোগো, নতুন পরিকল্পনা ও নতুন দিশার প্রতিশ্রুতি নিয়ে সামনে এগোবে বলেই জানানো হয়। অনুষ্ঠানে উচ্চারিত হয় সংগঠনের নতুন মূলমন্ত্র—‘উত্তরাধিকার কখনো অবসর নেয় না, সে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করে।’
বর্তমানে গানচিলের দায়িত্ব এককভাবে নেয়া করেছেন আসিফ ইকবাল। বিশেষ এই আয়োজনে তিন প্রতিষ্ঠাতা—নকীব খান, কুমার বিশ্বজিৎ ও রেজা রহমানকে ক্রেস্ট দিয়ে সম্মাননা জানানো হয়। কুমার বিশ্বজিৎ কানাডায় থাকায় সরাসরি উপস্থিত থাকতে না পারলেও ভিডিও কলের মাধ্যমে তিনি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে সকলের সঙ্গে আবেগ ভাগ করেন।
সম্মাননা গ্রহণকালে তিন প্রতিষ্ঠাতা যখন কথা বলেন, তখন তাদের কণ্ঠে গানচিলকে ঘিরে দীর্ঘদিনের ভালোবাসা, স্মৃতি ও কৃতজ্ঞতার ছাপ ফুটে ওঠে। অনেকেই আবেগে আপ্লুত হয়ে মুহূর্তে স্থবির। তাদের আশীর্বাদে অনুষ্ঠান আরও আবেগঘন হয়ে ওঠে—ঐক্যবদ্ধ প্রত্যাশা, যেন গানচিল আরো উঁচুতে উড়তে পারে।
সম্মাননার পর রঙ্গীন সাংস্কৃতিক পর্ব শুরু হয়। সাদা-সোশ্যালিক পরিবেশ থেকে বেরিয়ে মঞ্চে উঠে গান পরিবেশন করেন সালমা, কিশোর, মাহাদি, দোলা, কোনাল, নিলয়সহ আরও অনেকে। তাদের কণ্ঠে গেয়েছে গানচিলের বিখ্যাত গানগুলো, যা শ্রোতাদের স্মৃতিবৃত্তিতে একেকটি ব্যক্তিগত সোনালি অধ্যায়ের ঝলক তুলে আনে।
গানচিল ২০০৫ সালে সুস্থ ও মানসম্মত সংগীতচর্চার লক্ষ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করে। প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক সময়ে শ্রোতারা পেয়েছিল মেহরাব-রুমির ‘আড্ডা’ ও ‘বিউটির চরণদাসী’ জাতীয় অ্যালবাম। তবে ২০০৮–০৯ সালে পাইরেসি ও এফএম রেডিও সংস্কৃতির প্রভাবের কারণে সংগীতক্ষেত্রে নেতিবাচক সময় আসে। ২০১২ সালে অ্যালবাম প্রকাশ সাময়িকভাবে বন্ধ থাকলেও গানচিল থেমে থাকেনি; ২০১৫ সালের পর নতুন উদ্যমে প্রতিষ্ঠানটি আবারও সক্রিয় হয়। অনুষ্ঠানজুড়ে এই ইতিহাসের ছোট ছোট গল্পও মাইক্রোফোনে ভাগ করা হয়—বীরত্বের, ধীরস্থির প্রত্যাবর্তনের ও সৃজনমুখী প্রত্যয়ের।
আসিফ ইকবাল অনুষ্ঠানে গানচিলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও তুলে ধরেন। তিনি জানান, সামনে রয়েছে নাটক, গানচিল অরিজিনালস, নতুন মিউজিক এবং অদেখা বাংলাদেশের বিভিন্ন রূপ তুলে ধরবে ‘পথের গল্প’—যা দর্শক-শ্রোতাদের নতুন অভিজ্ঞতা দেবে।
পুরোনো আয়োজনটি উপস্থাপনা করেন মৌসুমী মৌ ও আবু হেনা রনি; তাদের প্রাণবন্ত উপস্থাপনায় পুরো অনুষ্ঠান আরও বর্ণিল হয়ে ওঠে। অনুষ্ঠানের শেষ দিকে দেখানো হয় গানচিল অরিজিনালসের দ্বিতীয় গান ‘ও জান’—এর মিউজিক্যাল ফিল্ম। গানটির কথা লিখেছেন আসিফ ইকবাল, কণ্ঠ দিয়েছেন কোনাল ও নিলয়; যৌথভাবে সুর করেছেন আভ্রাল সাহির ও পশ্চিমবঙ্গের লিংকন, সংগীতায়োজন করেছেন আভ্রাল সাহির। ভিডিওটি নির্মাণ করেছেন তানিম রহমান অংশু। নেপালের মুস্তাংয়ের জমসম অঞ্চলের মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক পরিমণ্ডলে শুটিং হওয়া সেই মিউজিক্যাল ফিল্মে পারফর্ম করেছেন সুনেরাহ বিনতে কামাল ও রেহান।
গানচিলের এই দুই দশক উৎসব ছিল স্মৃতিচারণের সঙ্গে নতুন শুরু করার একটা শক্তিশালী সংকেত—একই সঙ্গে দর্শক-শ্রোতাদের জন্য সঙ্গীতের নতুন অভিজ্ঞতা উপহার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি।

