ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলা (ডিআইটিএফ)-২০২৬ সমাপনীতে জানান হয়েছে, মেলায় মোট ২২৪ কোটি টাকার সম্ভাব্য রপ্তানি আদেশ হয়েছে এবং স্থানীয় বাজারে পণ্যের বিক্রয় মূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৯৩ কোটি টাকায়। গত বছরকার ডিআইটিএফ-২০২৫ের তুলনায় এই বিক্রয়ে ৩.৪২ শতাংশ বৃদ্ধি দেখা গেছে।
শনিবার (৩১ জানুয়ারি) রাজধানীর পূর্বাচলের বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ এক্সিবিশন সেন্টারে আয়োজিত সমাপনী অনুষ্ঠানে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন এসব তথ্য জানিয়েছেন। অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবুর রহমান। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর ভাইস-চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ হাসান আরিফ ছিলেন গেস্ট অব অনার।
উপদেষ্টা জানান, ডিআইটিএফ-২০২৬ এ দেশি-বিদেশি মিলিয়ে মোট ৩২৯টি প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ ছাড়া ভারতের, তুরস্কের, সিঙ্গাপুরের, ইন্দোনেশিয়ার, হংকংয়ের ও মালয়েশিয়ার মোট ১১টি প্রতিষ্ঠান এ আয়োজনে অংশ নেন। প্রতিষ্ঠানগুলোর সরবরাহ থেকে সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী সম্ভাব্য রপ্তানি আদেশের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৭.৯৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় ২২৪.২৬ কোটি টাকায়।
রপ্তানিতে বেশ কয়েকটি খাত এগিয়ে ছিল। আদেশ এসেছে বহুমুখী পাট পণ্য, ইলেকট্রিক ও ইলেকট্রনিক্স, হোম অ্যাপ্লায়েন্স, কসমেটিক্স, হাইজিন পণ্য, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, হ্যান্ডলুম, তৈজসপত্র, হোম টেক্সটাইল, নকশী কাঁথা ও ফেব্রিক্স ইত্যাদি থেকে। রপ্তানি আদেশ দেওয়া দেশের মধ্যে রয়েছে আফগানিস্তান, সিঙ্গাপুর, হংকং, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া ও তুরস্ক।
স্থানীয় ক্রয়-বিক্রয়ের পরিসংখ্যানে রেস্তোঁরা সহ মেলার ভেতরে ও বাইরের লেনদেন মিলিয়ে সরাসরি বিক্রি হয়েছে প্রায় ৩৯৩ কোটি টাকার পণ্য ও সেবা। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী এ বছর মেলার আকর্ষণ বাড়াতে অনলাইনে স্টল-বণ্টন ও টিকিটিং ব্যবস্থা চালু রাখা হয়েছিল এবং দর্শনার্থীদের যাতায়াতে বিশেষ ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছিল—বিআরটিসির ডেডিকেটেড বাস সার্ভিস ও কনসেশনে প্যাঠাও সার্ভিস চালু করা হয়।
মেলায় পণ্য প্রদর্শন ও বিক্রয়ের পাশাপাশি রপ্তানি বর্ধন ও বাজার বহুমুখীকরণের লক্ষ্যে বিস্তৃত সাইডলাইন কর্মসূচি পরিচালিত হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, সরকারি ট্রেড প্রমোশন সংস্থা (BSCIC, SME Foundation, JDPC), পণ্যভিত্তিক ট্রেড অ্যাসোসিয়েশন (BPGMEA, BGAPMEA, BFPIA, BanglaCraft) এবং উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা (World Bank, GIZ, FCDO, BSI)–এর সমন্বয়ে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো আটটি সেমিনার আয়োজন করে।
বহুমুখী পণ্য প্রদর্শন হয়েছে—কটেজ, মাইক্রো, ক্ষুদ্র, মাঝারি ও ভারী শিল্পের পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, ফার্নিচার, ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক্স, কসমেটিক্স, গৃহসজ্জা, খেলনা, স্টেশনারিজ, হোম ডেকর, ক্রোকারিজ, হস্তশিল্প, প্লাস্টিক, মেলামাইন, হারবাল ও টয়লেট্রিজ, ইমিটেশন জুয়েলারি, রিয়েল এস্টেট সেবা এবং ফাস্টফুডসহ নানাবিধ সেবা-সামগ্রী।
মেলার আকর্ষণ বাড়াতে বিশেষ আয়োজনও ছিল—দেশীয় লোকসঙ্গীত ও আধুনিক সংগীতের মিশেলে সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা, সিনিয়র সিটিজেন কর্নার, মা ও শিশু সেবা কেন্দ্র, শিশু পার্ক এবং দেশীয় ইতিহাস স্মরণে বাংলাদেশ স্কয়ারে স্থিরচিত্র প্রদর্শন। বিদেশি সম্ভাব্য ক্রেতাদের সুবিধার জন্য সাতটি রপ্তানি খাতের সক্ষমতা তুলে ধরে Export Enclave তৈরি করা হয়েছিল।
নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য-সতর্কতায় সিসিটিভি সার্ভেইল্যান্স, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি, ফায়ার ব্রিগেড মোতায়েন এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের হাত ধরে স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন চালানো হয়েছে। খাদ্য ও পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ এবং ভোক্তা হয়রানি রোধে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর মেলায় নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করেছে।
সমাপনীতে নির্মাণ কাঠামো, স্থাপত্য সৌন্দর্য, পণ্য প্রদর্শন, দর্শক-ক্রেতা সেবা, স্বাস্থ্যবিধি ও নবীন উদ্ভাবন বিবেচনায় বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ৪০টি প্রতিষ্ঠানকে শ্রেষ্ঠ হিসেবে নির্বাচিত করে পুরস্কৃত করা হয়; পুরস্কার তুলে দেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন।
ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান, ক্রেতা ও দর্শকদের মিলিত আগ্রহে এবারের ডিআইটিএফ কেবল বিক্রয় ও রপ্তানির দিকে নয়—নতুন যোগাযোগ, প্রযুক্তি ও বাজার সন্ধানের প্ল্যাটফর্ম হিসেবেও প্রমাণ করেছে। জানানো হয়েছে, সংগৃহীত ফলাফল বিশ্লেষণের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে মেলার কার্যক্রম আরও বিস্তৃত ও লক্ষ্যভিত্তিকভাবে পরিকল্পনা করা হবে।
(আজকালের খবর/বিএস)

