বিএনপির চেয়ারপারসন তারেক রহমান বলেছেন, যারা নারীদের অসম্মান করে, যারা মিথ্যার আশ্রয় নেয় এবং জনগণের ভোটাধিকার হরণ করে—তারা কখনই দেশপ্রেমিক বা জনদরদি হতে পারে না। তিনি এই কথা বলেছেন সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) খুুলনার প্রভাতী স্কুলমাঠে অনুষ্ঠিত বিএনপির নির্বাচনি জনসভায়, বেলা পৌনে ১টার দিকে।
তারেক রহমান বলেন, শুধু কথার ফুলঝুরি নয়—বাস্তব কর্মের মাধ্যমেই বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে হবে। বিএনপি সরকার গঠন করলে প্রথম কর্তব্য হবে দেশ পুনর্গঠন করা। দেশ গড়তে হবে দল-মত, শ্রেণি ও পেশার নির্বিশেষে; শুধু একটি শ্রেণি নিয়েই এটি সম্ভব নয়।
তিনি সংখ্যাগত বাস্তবতারও দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, দেশের জনসংখ্যা প্রায় ২০ কোটি এবং এর অর্ধেকই নারী। এই বিশাল নারী সমাজকে পেছনে রেখে যত বড় পরিকল্পনাই করা হোক না কেন দেশকে এগিয়ে নেওয়া যাবে না। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া স্কুল থেকে ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন—যার ফলে নারীরা শিক্ষিত হয়ে স্বাবলম্বী হতে পেরেছেন।
তারেক রহমান দ্রুত প্রসঙ্গ পাল্টে এক প্রতিপক্ষ দলকে কড়া সমালোচনা করেন এবং বলেন, সম্প্রতি ওই দলের এক নেতা কর্মসংস্থানে নিয়োজিত মা-বোনদের উদ্দেশ্যে অশোভন ভাষা ব্যবহার করেছেন—যা দেশের জন্য কলঙ্কজনক। সেই দল প্রকাশ্যে বলেছে তারা নারীর নেতৃত্বে বিশ্বাস করে না; পরে আইডি হ্যাকের অজুহাত দিলেও বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছে এমনভাবে আইডি হ্যাক হওয়া সম্ভব নয়। নির্বাচনের আগে জনগণের সামনে এটা কেবল মিথ্যাচার এবং বাস্তব চরিত্র প্রকাশের চেষ্টা, বলেন তিনি।
তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, লক্ষাধিক নারী পোশাক শিল্পে কাজ করে দেশের অর্থনীতি সচল রেখেছেন। নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের নারীরা দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে সংসার চালাতে স্বামী-সন্ততির পাশাপাশি কাজ করছেন—তবু তাদেরই সম্মানহানি করা দুঃখজনক।
আরও বলেন, যারা ইসলাম কায়েমের কথা বলেন, তারা ভুলে যাচ্ছেন নবী করিম (সা.)-এর সহধর্মিণী হজরত বিবি খাদিজা (রা.) ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী। তাই নারীদের কর্মজীবনকে অপমান করার কোনো অধিকার কারো নেই।
আবার তিনি দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে বলেন, বিগত সময়ে বিএনপির অসংখ্য নেতাকর্মী গুম, খুন ও হত্যার শিকার হয়েছেন; হাজারো—লাখো নেতাকর্মী গায়েবি মামলা, নির্যাতন ও নিপীড়নের মুখে পড়েছেন। বাংলাদেশী মানুষ টানা ১৬ বছর তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি; শুধু জাতীয় নির্বাচন নয়, স্থানীয় স্তরে থেকেও মানুষ তাদের ভোটাধিকার ব্যবহার করতে পারেনি। কথা বলার চেষ্টা করলে মানুষকে রাতের আঁধারে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, গুম করা হয়েছে বা খুন করা হয়েছে।
তারেক রহমান বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে দল-মত নির্বিশেষে মানুষ রাজপথে নামে এবং স্বৈরাচারকে বিদায় করে—এখন অধিকার আদায়ের সময় এসেছে। আগামী ১২ তারিখের সাধারণ নির্বাচনে, ইনশাল্লাহ, জনগণ তাদের অধিকার প্রয়োগ করবে, যা দীর্ঘদিন ধরে থেকে তাদের বঞ্চিত রাখা হয়েছে।
বিএনপি সরকার গঠিত হলে প্রতিটি পরিবারে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ পৌঁছে দেওয়া হবে—এই কার্ডের মাধ্যমে ধাপে ধাপে নারীদের স্বাবলম্বী করে তোলা হবে যাতে তারা কারও উপর নির্ভর না করে নিজেরা সমর্থ হতে পারে। খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের মতো একসময়কার শিল্পনগরীকে পুনরায় জীবন্ত শিল্পকেন্দ্রে রূপান্তরের প্রতিশ্রুতি দেন তিনি এবং নারী-পুরুষ উভয়ের কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দেন।
তরুণদের জন্য আইটি পার্ক ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা গড়ে তোলা হবে। কৃষকদের জন্য চালু করা হবে ‘কৃষি কার্ড’—এর মাধ্যমে ঋণ, সার, বীজ ও কীটনাশক সহজে পাওয়া যাবে। বর্তমানে যেসব কৃষকের ১০ হাজার টাকার পর্যন্ত ঋণ রয়েছে, সেগুলো সুদসহ মওকুফ করা হবে।
আলোচ্য কর্মকাণ্ডগুলো বাস্তবায়ন করে দেশের নারী সমাজকে স্বাবলম্বী করা, বেকারদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা, শিক্ষার মান উন্নত করা ও উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে জনগণের প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়া সম্ভব হবে—এই বিশ্বাস ব্যক্ত করে তারেক রহমান তার বক্তব্য শেষ করেন।

