বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ইসলাম ও নবী মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে কথিত আপত্তিকর মন্তব্যের বিরুদ্ধে গতকাল রাজধানীর একাধিক এলাকায় প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছে খেলাফত মজলিস।
মিরপুর, মোহাম্মদপুর, সায়দাবাদ, খিলগাঁও, আজিমপুর, ডেমরা, মালিবাগ সহ ঢাকার বিভিন্ন স্থানে তাদের বিক্ষোভ মিছিল ও জনসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সংগঠনটি থেকে নাস্তিক্যবাদের প্রচার করা সব ধরনের ব্লগ ও ওয়েবসাইট তাৎক্ষণিক বন্ধসহ সংশ্লিষ্ট ব্লগারদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি প্রদানের আহ্বান জানানো হয়েছে।
প্রতিবাদে অংশগ্রহণকারীরা দাবি করেন, ইন্টারনেটে একশ্রেণির লেখক ও ব্লগার ইসলাম ধর্ম এবং নবী করিম (সা.)-কে নিয়ে ক্রমাগত কুরুচিপূর্ণ ও অশোভন মন্তব্য প্রকাশ করে আসছেন। সমাবেশস্থলে তারা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানান ও স্লোগান দেন। মিছিলে অংশগ্রহণকারী বেশ কয়েকজন কর্মী সাংবাদিকদের জানান, নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর বিরুদ্ধে কোনো ধরনের নেতিবাচক মন্তব্য তারা বরদাশত করবেন না এবং আল্লাহর বিধান লঙ্ঘনকারীদের ‘দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়া’ তাদের ধর্মীয় কর্তব্য বলে মনে করেন।
বায়তুলমাল সম্পাদক মাওলানা ফজলুর রহমান বলেন, “এসব নাস্তিক ব্লগার মুসলিম জনগণের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানছে প্রতিদিন। আমাদের ইসলামী মূল্যবোধকে ধ্বংস করার জন্য তারা একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। সরকার যদি এখনই কঠোর হাতে এদের দমন না করে, তাহলে আগামীতে এদের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাবে এবং সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। আমরা চাই এদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে মামলা দায়ের করা হোক।”
খেলাফত মজলিসের নেতা মাওলানা কোরবান আরী কাসেমী সমাবেশে বক্তব্যে অভিযুক্ত ব্লগারদের কঠোর সমালোচনা করে তাদের ‘মুরতাদ’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “এসব ধর্মদ্রোহীদের কারণে আমাদের সমাজ ক্রমশ নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে। তরুণ প্রজন্ম বিপথে চালিত হচ্ছে এদের প্ররোচনায়। ইসলাম ও আমাদের প্রিয় নবীজির বিরুদ্ধে এমন কুৎসা রটানোর দুঃসাহস তারা কোথা থেকে পেল? প্রকাশ্যে ফাঁসির মাধ্যমে এদের দৃষ্টান্তমূলক সাজা না দিলে দেশে প্রকৃত শান্তি আসবে না। আমাদের নতুন বাংলাদেশে এসব নাস্তিক-ধর্মত্যাগীদের কোনো স্থান থাকতে পারে না।”
খেলাফত মজলিসের আরেক নেতা মাওলানা আলী উসমান বলেন, “বাংলাদেশ একটি মুসলিম রাষ্ট্র। এই পবিত্র ভূমিতে নাস্তিকতা ও কুফরির প্রচার কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আমরা দেখছি এসব ব্লগার বিদেশি শক্তির প্ররোচনায় ইসলামের বিরুদ্ধে বিষোদগার করছে। আমাদের তরুণ প্রজন্মকে বিপথগামী করার জন্য তারা অনলাইন ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ইসলামবিরোধী প্রচারণা চালাচ্ছে। জাতির স্বার্থে এই মুহূর্তে সরকারকে এদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।”
প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক মাওলানা হারুনুর রশীদ ভূঁইয়া বলেন, “আমরা আজ এখানে শান্তিপূর্ণভাবে আমাদের দাবি জানাতে এসেছি। কিন্তু সরকার যদি আমাদের ন্যায্য দাবি উপেক্ষা করে, তাহলে দেশব্যাপী আরও বড় কর্মসূচি ঘোষণা করতে বাধ্য হব। প্রতিটি মসজিদ থেকে, প্রতিটি মাদ্রাসা থেকে লক্ষ লক্ষ ধর্মপ্রাণ মুসলমান রাস্তায় নেমে আসবে। নাস্তিক ব্লগারদের বিচার না হওয়া পর্যন্ত আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাব। আমরা চাই ‘সংশয়’, ‘এথিস্ট নোট’, ‘মুক্তমনা’, ‘অধার্মিক’, ‘এথিস্ট জাংশন’সহ যেসব ওয়েবসাইট ইসলামবিরোধী লেখা প্রকাশ করছে, সেগুলো আজই বন্ধ করে দেওয়া হোক।”
মুফতি হাবীবুর রহমান কাসেমী বলেন, “ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধে কুৎসা রটায়, তাদের শাস্তি অত্যন্ত কঠোর। এই নাস্তিক ব্লগাররা জেনেশুনে আমাদের পবিত্র ধর্মকে কলঙ্কিত করার চেষ্টা করছে। তারা বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত একটি সুসংগঠিত চক্রের অংশ। আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি, এদের বিরুদ্ধে জাতীয় নিরাপত্তা আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হোক এবং এদের সকল কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হোক।”
সংগঠনটির নির্বাহী সদস্য মাওলানা এনামুল হক নূর বলেন, “বাংলাদেশের শতকরা ৯৫ ভাগ মানুষ মুসলিম। এই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে নাস্তিক্যবাদকে কখনোই সহ্য করা যায় না। আমরা সব ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ একযোগে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে দৃঢ়ভাবে দাবি জানাচ্ছি—সমস্ত নাস্তিকতার প্রচার করা ব্লগ, পত্রিকা ও ওয়েবসাইট চিরতরে নিষিদ্ধ করতে হবে। এসব ধর্মবিরোধীদের দম্ভ সীমা ছাড়িয়ে গেছে। তারা ক্রমাগত আমাদের পবিত্র ইসলাম ধর্মকে আক্রমণ করছে। সকল নাস্তিক লেখক ও ব্লগারকে গ্রেফতার করে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।”
খেলাফত মজলিসের সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুর রহমান হেলাল বলেন, “আমরা বেশ কিছুদিন যাবৎ পর্যবেক্ষণ করছি যে আসিফ মহিউদ্দিন, ইশতিয়াক আহমেদ, নাদিয়া ইসলাম, সুব্রত শুভ, দৃষ্টি দে, আসাদ নূর, সাইফুর রহমান, নাফিউর রেজওয়ান, অমি রহমান পিয়াল, নিলুফার হক, আরিফুল ইসলাম, জয় বিশ্বাসসহ প্রায় ৩০-৩৫ জন ব্লগার ও লেখক নিয়মিত ইন্টারনেটে ইসলাম ধর্ম ও নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর বিরুদ্ধে অশালীন ভাষায় আপত্তিকর বক্তব্য প্রচার করছেন। একাধিকবার সতর্ক করার পরও তারা এসব অসদাচরণ থেকে বিরত হননি। বরং তাদের দুঃসাহস দিনকে দিন বাড়ছে। সরকারের উচিত এদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে নজির স্থাপন করা, যেন ভবিষ্যতে ইসলামকে এভাবে অবমাননা করার সাহস কেউ না পায়।”
সমাবেশে আরেক বক্তা, মাওলানা শাহীনুর পাশা বলেন, “নতুন বাংলাদেশে নাস্তিকদের কোনো ঠাঁই নেই। এ দেশ ৩৬০ আউলিয়ার পবিত্র ভূমি। ইসলাম ও আমাদের প্রিয় নবীজির সম্মান এদেশের প্রতিটি মুসলমানের হৃদয়ে প্রোথিত। এসব দুর্বৃত্তদের কারণে আমাদের শান্তি বিনষ্ট হতে দেব না।”
এদিকে এধরনের সমাবেশের কারনে ব্লগার ও মুক্তমনা লেখক ও ব্লগারদের মনে নতুন করে আতঙ্ক জন্মেছে। তারা মনে করেন এ ধরনের সমাবেশ ও ব্লগারদের শাস্তির দাবি লেখকদের বাক স্বাধীনতার পরিপন্থী।

