তৃতীয় দিনের মধ্যেই আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি দ্বিপক্ষীয় শুল্ক চুক্তি স্বাক্ষরের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় দেশের ব্যবসায়ী ও বিশ্লেষকদের মধ্যে তীব্র প্রশ্ন ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সূত্র বলছে, চুক্তিটি সই হওয়ার সম্ভাব্য তারিখ আগামী সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) — যেখানে চুক্তির খসড়া ও শর্তাবলি এখনও গোপন রাখা হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন কতটা যুক্তিযুক্ত এবং নির্বাচিত সরকারের ওপর এর প্রভাব কী হবে—এসব বিষয়ে স্পষ্টতা নেই। সরকারি বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, চুক্তি সংক্রান্ত তথ্য গোপন রাখার শর্তে আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট (এনডিএ) করা হয়েছে, ফলে খসড়া ও শর্তাদি ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট মহলে পৌঁছায়নি। এই গোপনীয়তাই উদ্বেগের প্রধান কারণ বলে তারা জানিয়েছেন।
ব্যবসায়ীদের বক্তব্য — যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক চুক্তি হলে রপ্তানিতে সুবিধা আসতে পারে। কিন্তু সেই সুবিধার বিনিময়ে কোন শর্ত মেনে নিতে হবে, বাংলাদেশী শিল্প বা অভ্যন্তরীণ বাজারের ওপর তার কী প্রভাব পড়বে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য না থাকায় অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
তৈরি পোশাক খাতের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ইনামুল হক খান বলেন, চুক্তির খসড়াকে নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা জরুরি। তিনি বলেন, ‘‘এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিতে কারা উপকৃত হবে এবং কারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে—যদি তা জানা না থাকে তখন সিদ্ধান্ত নেওয়া সমীচীন নয়।’’ তিনি আশা প্রকাশ করেন, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে কমে ১৫ শতাংশে নামতে পারে, তবে নির্বাচনের ঠিক আগে চুক্তি সইয়ের সিদ্ধান্ত তাকে অবাক করেছে।
রপ্তানিকারকদের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বাজারের ব্যবসায়ীরাও এ বিষয়ে উদ্বিগ্ন। ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, ‘‘চুক্তির খসড়া সম্পর্কে কিছুই না জানলে মন্তব্য করা কঠিন। এ ধরনের সিদ্ধান্ত নির্বাচিত সরকারের মাধ্যমে নেয়া উচিত ছিল।’’
বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি কেবল শুল্ক-সংক্রান্ত চুক্তি নয়; এর দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব থাকতে পারে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-র সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, চুক্তিটি স্বচ্ছভাবে হচ্ছে না এবং খসড়া গোপন রাখায় সুফল-ঘাটতি যথাযথভাবে বিচার করা হয়নি। তিনি মনে করেন, নির্বাচনের পরে হলে রাজনৈতিক দলগুলো বিষয়টি নিয়ে আলোচনার সুযোগ পেত।
সরকারি সূত্রে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র চুক্তিতে শুল্ক ও অশুল্ক বাধা, ডিজিটাল বাণিজ্য ও প্রযুক্তি, উৎপত্তি নিয়ম (রুলস অব অরিজিন), জাতীয় নিরাপত্তা ও বাণিজ্য সংক্রান্ত বিভিন্ন অঙ্গভূমি সংযুক্ত করতে চায়। পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে কৃষিপণ্য, উড়োজাহাজ ও যন্ত্রাংশ, এলএনজি আমদানি বাড়ানোর ইচ্ছা রয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রায় ৬০০ কোটি মার্কিন ডলার এবং আমদানি প্রায় ২০০ কোটি ডলার। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই ব্যবধান কমাতে হলে যে শর্তে বাংলাদেশি বাজার আরও উন্মুক্ত করতে হবে, সেগুলো দেশের শিল্প-বাণিজ্য ও ভোক্তা-হিতকে কীভাবে প্রভাবিত করবে—এ বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
বিশ্লেষকদের মতে, কোনো অস্থায়ী সরকার নির্বাচনের ঠিক আগে এমন একটি চুক্তি করলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে; চুক্তি সইয়ের সময়সীমা কিছুটা টানতে পারলে আলোচনার সুযোগ বাড়ত। তড়িঘড়ি করে চুক্তি করলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাসহ নানা বিতর্ক বাড়ে।
এছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের কাছের সময়ে আরও কয়েকটি বড় চুক্তি করা হয়েছে—গত বছরের নভেম্বরে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় নতুন টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালের সঙ্গে ৩৩ বছরের চুক্তি, বুড়িগঙ্গার তীরে পানগাঁও নৌ টার্মিনাল ২২ বছরের জন্য সুইস কোম্পানি মেডলগ এসএ-র কাছে তুলে দেয়ার মত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডিপিওয়ার্ল্ড থেকে নেওয়া-এ ধরনের বড় অনুষ্পানগুলোও দেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে।
জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, বিষয়টি একটি চলমান প্রক্রিয়া। তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, ভোটের মাত্র তিন দিন আগে এমন নজির বিরল এবং চুক্তি সই করায় প্রশ্নোত্তর চলবে।
চূড়ান্তভাবে ব্যবসায়ী ও বিশ্লেষকদের দাবি — চুক্তির খসড়া দ্রুত প্রকাশ করে স্বচ্ছ আলোচনার সুযোগ দেয়া হোক, যাতে দেশের শিল্প, কর্মসংস্থান ও অর্থনীতির ওপর সম্ভবনামত ক্ষতি বা সুবিধা দুটোরই পরিমাপ করে সিদ্ধান্ত নেয়া যায়।

