ময়মনসিংহের জনপ্রিয় ও শিল্পকলা পদকপ্রাপ্ত বাউল শিল্পী সুনীল কর্মকার আর নেই। বুধবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়, এ খবর নিশ্চিত করেছেন ময়মনসিংহ জেলা বাউল সমিতির সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম আসলাম।
শিল্পকলা সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং সংগীতপ্রেমীদের কাছ থেকে শোক প্রকাশ করে বলা হচ্ছে, সুনীল কর্মকার ছিলেন লোকসংগীতের একজন অসাধারণ শিল্পী, বিশেষ করে বাউল মালজোড়া গান, মহাজনী গান ও অন্যান্য লোকসংগীতের ক্ষেত্রে তার পদচারণা ছিল অতুলনীয়। આંખের দৃষ্টি না থাকলেও সংগীতের প্রতি তার অসীম ভালোবাসা ও নিবেদন তাকে দৃষ্টিহীন হয়েও সংগীতাঙ্গনে আলাদা স্থান করে দিয়েছে।
তিনি ১৯৫৯ সালের ১৫ জানুয়ারি পূর্ব ময়মনসিংহের নেত্রকোণা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার বারনাল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা দীনেশ কর্মকার এবং মা কমলা কর্মকার। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন জ্যেষ্ঠ। দ্বিতীয় ভাই দীলিপ কর্মকার পেশায় স্বর্ণশিল্পী, আর ছোট ভাই শ্রীমল কর্মকার। ১৯৭১ সালে তার বাবা-মা মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে আশ্রয় শিবিরে অসুস্থ হয়ে মারা যান।
সুনীলের একাকী ছোটবেলা ছিল গানকা স্বপ্নের মাঝখানে। মাত্র সাত বছর বয়সে গানের প্রতি তার গভীর আগ্রহ জন্ম নেয়। পাশের গ্রামের বিখ্যাত গীতিকবি জালাল উদ্দিন খাঁর বাড়িতে বসত সংগীতের বিশাল আসর। সেখানে যেতে যেতে তার ক্রিকেট বা অন্য কিছু নয়; শুধু গানই ছিল তার জীবনের আলো।
দুর্ভাগ্যবশত, টাইফয়েড রোগে আক্রান্ত হয়ে তার দু চোখের দৃষ্টি হারাতে হয়। কষ্ট ভরা অন্ধকারে ঢোকার পরও সংগীতের প্রতি তার ভালোবাসা অটুট ছিল। এরই ধারাবাহিকতায় বাবা তাকে প্রথমে পাশের গ্রামের বাউল গায়ক ইসরাইল মিয়ার কাছে নিয়ে যান। শৈশবেই তিনি গুরু ইসরাইল মিয়ার ছাত্রত্ব গ্রহণ করেন এবং তাঁকে সংগীতের বিভিন্ন দিক শিক্ষা দেন। তিনি সিংহের গাঁয়ে দোতারা বাদনে দক্ষতা অর্জন করেন।
তার স্ত্রী আশা রানী কর্মকার জানান, কিছু দিন আগে তার স্বামী নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। শেষ সময়ে তার ইচ্ছা ছিল গৌরীপুরের কলতাপাড়া এলাকায় তার কবর তৈরি করার।
সুনীল কর্মকারের সংগীতজীবনের শুরু খুবই ছোটবেলায়। মাত্র সাত বছর বয়সে হারমোনিয়াম শেখেন এবং তবলা শেখেন প্রতিবেশী কাকা গোবিন্দ কর্মকারের কাছে। পরে লখনৌর ধরণী পুষ্পিত বেহালাবাদক মীর হোসেনের কাছ থেকে বেহালার তালিম নেন। সময়ের সাথে সাথে দেশি ও বিদেশি বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রে পারদর্শিতা অর্জন করেন। তার স্পর্শে একতারা, দোতারা, স্বরাজ, হারমোনিয়াম জীবন্ত হয়ে উঠত, একইসাথে খমক, খঞ্জনি, ঢোল, ঢাক, ঢোলকও প্রাণ ফিরে পেত।
লোকসংগীতের অমূল্য অবদানের জন্য ২০২২ সালে তিনি শিল্পকলা পদক অর্জন করেন। দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ থাকায় তার মৃত্যু হয় বলে জানা গেছে।
সুনীল কর্মকারের মরদেহ বুধবার দুপুরে ময়মনসিংহ কোতয়ালি থানার পাশে হজরত কালু শাহ ফকিরের মাজারের সামনে রাখা হয়। তার জন্য গভীর শ্রদ্ধা জানানো হয় এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন ও ব্যাক্তি থেকে শোক প্রকাশ করা হয়েছে। নেত্রকোণা সাহিত্য সমাজের নেতৃবৃন্দও তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।

