চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর এখন দেশের আলোচনার কেন্দ্রে। এটিকে অনেকেই বলে থাকেন ‘বাংলাদেশের ভেতর আরেক দেশ’ এবং ‘সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল’। এখানকার দুর্গম ও পাহাড়ি প্রাকৃতিক পরিবেশের কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর জন্য এখানে কার্যক্রম চালানো খুবই জটিল। ফলে, মূলত, এটি অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে বলে অনেকের অভিযোগ। সদ্য সময়ে এর গুরুত্ব বেশি বেড়ে যায় যখন র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) মহাপরিচালক একেএম শাহিদুর রহমান ঘোষণা করেন, জঙ্গল সলিমপুর এখন সন্ত্রাসীর আঁতুড়ঘর। এর কারণ হলো, ১৯ জানুয়ারি একটি অভিযানে গিয়েছিলেন র্যাবের দল, তবে তারা হামলার শিকার হন এবং একজন কর্মকর্তা নিহত ও বেশ কয়েকজন আহত হন। এই অঘটনের পর থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই এলাকা দখলের জন্য অভিযানের প্রস্তুতি চলছে। তবে, এই অভিযানের সফলতা কেমন হবে সেটি এখনই বলা যাচ্ছে না। কারণ, এর পিছনের ইতিহাস জানা জরুরি।সম্প্রতি প্রকাশিত সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, কিছু দুর্বৃত্ত র্যাবের দুটো গাড়িকে ধাওয়া করছে, গাড়ির গ্লাস ভাঙছে এবং প্রকাশ্যে গুলি চালাচ্ছে। হামলাকারীরা র্যাবের সদস্যদের আটক করে অস্ত্র ছিনিয়ে নেয়। হামলার সময় তারা মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেয়, যেন গেট বন্ধ করে দেয়। এই হামলায় র্যাবের একজন কর্মকর্তা মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হন, আর তিনজন আহত হন। এ ঘটনায় একটি মামলা চলছে, যেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখন জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচার দাবি করছে। স্থানীয় সাংবাদিকরা বলছেন, এই হামলা ও পরিস্থিতির জন্য একচেটিয়া দায়ী অত্র এলাকার নিয়ন্ত্রণকারী বিভিন্ন গ্রুপ—যেমন, ইয়াসিন, রোকন, ও রিদোয়ান গ্রুপ। এর পেছনে রয়েছে আধিপত্য, অপরাধমূলক কার্যক্রম ও রাজনৈতিক ছত্রছায়া। জঙ্গল সলিমপুরের নাম শুনলেই মনে হয় এটি কোনও দূরবর্তী দুর্গম এলাকা, কিন্তু বাস্তবে শহর থেকে মাত্র ১৫ থেকে ২০ মিনিটের পথ। এখানে রয়েছে প্রায় ২০-২৫ হাজার অবৈধ বসতি, যেখানে এক থেকে দেড় লাখের বেশি মানুষ বাস করে। এই মানুষেরা নানা পেশাজীবী, কিন্তু সবচেয়ে বিপদজনক বিষয় হলো, এই এলাকাটি অপরাধীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল ও দুর্বৃত্তদের কার্যকলাপের কেন্দ্রবিন্দু। এলাকার প্রবেশ ও বাহিরে চলাচলের জন্য রয়েছে একাধিক সুরক্ষা। স্থানীয়রা বলছিলেন, এই এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে বিভিন্ন গ্রুপ, যারা নিজেদের স্বার্থে অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যে বেশিরভাগ সময়ে দেখা যায়, রাজনৈতিক দিক থেকে এমনকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও এই গুটিকয়েক গ্রুপের স্বার্থে অনুমোদন দেয়। এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করা বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। অতীতে, প্রশাসন অনেকবার উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করলেও, নানা বাধা ও প্রতিরোধের কারণে কিছুই সংহত হয়নি। ২০২২ সালে একবার র্যাবের সঙ্গে এই এলাকার সন্ত্রাসীদের সংঘর্ষ ঘটে, ও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ আন্দোলন ব্যর্থ হয়। এরপর থেকে, সরকারি নানা প্রকল্প হবার কথা থাকলেও, যথাযথ নিয়ন্ত্রণ ও কার্যকরী উদ্যোগের অভাবে এগুলো আর এগোয়নি। এই এলাকাটি রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক দিক থেকেও অবিচলিত একটি অংশ। অনেকের ধারণা, স্থানীয় রাজনীতির কারণে এই এলাকাকার পাতানো শক্তি ও দখলদারির কারণগুলো সহজে দখল বা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে না। পরিস্থিতি এতটাই জটিল যে, সন্ত্রাসীদের জন্য এটি মূলোৎপাদন কেন্দ্র এবং নিরাপদ ঘাটি। স্থানীয় বিশ্লেষকদের মতে, একের পর এক অভিযান ব্যর্থ হওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে মানব ঢাল ব্যবস্থার প্রভাব। এই এলাকার মানুষজন অধিকাংশই ছিন্নমূল ও দরিদ্র, যারা ভয় পান সাহস করে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ধরণের পদক্ষেপ নিতে। পুলিশ ও র্যাবের কর্মকর্তারা বলছেন, এই এলাকায় অজস্র ছিন্নমূল ও অপ্রাপ্তবয়স্কদের উপস্থিতি অভিযানের জন্য আরও বড় চ্যালেঞ্জ সৃষ্টির জন্য দায়ী। এই পরিস্থিতি দেখতে গিয়ে বোঝা যায়, দেশের জন্য এই এলাকাটি একটি বড় সমস্যা। সরকারের অধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা বলছেন, এখানকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব, তবে এর জন্য প্রয়োজন সুস্থ পরিকল্পনা, কঠোর অভিযান এবং এলাকায় শান্তিপূর্ণ জীবন প্রতিষ্ঠার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। এই সকল উদ্যোগ গ্রহন করতে গেলে অবশ্যই মানবিক দিক বিবেচনায় রাখতে হবে, কারণ যদি এভাবে অভিযানে প্রচুর মানুষ মারা যায় বা আহত হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে। শেষ কথা বলছে, অবশ্যই, এই এলাকা নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হলেও, এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কঠোর অভিযান ও স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা। যেহেতু জঙ্গল সলিমপুর এক বিশাল মানবসম্পদ ও অপরাধ জগতের সংযোগস্থল, এর নিয়ন্ত্রণে নেয়ার জন্য সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। এর মাধ্যমে কেবলমাত্র এই অন্ধকার থাবা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।