যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু হওয়ার এক বছরে দেওয়া এক দীর্ঘ বক্তৃতায় করা বেশ কয়েকটি অর্থনৈতিক দাবিই সরকারি পরিসংখ্যান ও স্বাধীন যাচাইয়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে আল-জাজিরার ফ্যাক্ট-চেক প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে। মূল্যস্ফীতি, ওষুধের দাম, শুল্ক নীতি ও শ্রম বাজার সংক্রান্ত যে উপাত্তগুলো তিনি তুলে ধরেছেন, অনেকটাই সরকারি নথিপত্রের সাথে মিলছে না।
মূল্যস্ফীতি নিয়ে ট্রাম্পের দাবি ছিল গত কয়েক মাসে ‘‘কোনো মূল্যস্ফীতি নেই’’ এবং মূল মূল্যস্ফীতি তিন মাস ধরে ১.৬ শতাংশের মধ্যে আছে। তবে শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিএলএস)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত নভেম্বর ও ডিসেম্বরে মূল মূল্যস্ফীতি ছিল প্রায় ২.৬ শতাংশ এবং সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ২.৭ শতাংশে—অর্থাৎ ট্রাম্পের উল্লেখিত সংখ্যা সরকারি তথ্যের সঙ্গে মেলে না।
ওষুধের মূল্য কমানোর ক্ষত বোঝাতে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন তার ‘‘সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত দেশ’’ কর্মসূচির ফলে ওষুধের দাম ৩০০ থেকে ৬০০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কোনো পণ্যের দাম যদি ১০০ শতাংশ কমে তবে তা অর্থাৎ বিনামূল্যে পাওয়া—আর ১০০ শতাংশের বেশি কমার কথাই বললে তা বাস্তবসম্মত নয়। ফলে ট্রাম্পের ৩০০–৬০০ শতাংশের সংখ্যাটি গাণিতিক ও বাস্তবপরিপ্রেক্ষিতে অগ্রহণযোগ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শুল্ক নীতিকে কেন্দ্র করে ট্রাম্পের বাইডেন প্রশাসনকে শুল্ক আরোপ করেনি বলে যে দাবি করেছিলেন, সেটিও তথ্যের বিপরীত। প্রতিবেদনের উপাত্ত অনুযায়ী, বাইডেন প্রশাসন রাশিয়ার ওপর ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত, চীনের ইলেকট্রিক গাড়ির ওপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত এবং সেমিকন্ডাক্টর চিপের ওপর ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করেছিল।つまり, শুল্ক নিয়ে ট্রাম্পের দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা নয়, বরং তথ্য আংশিকপ্রশ্নাত্মকভাবে ভিন্ন।
সুপ্রীম কোর্টে চলমান শুল্ক মামলার বিষয়ে ট্রাম্পের বক্তব্য আংশিক সঠিক হলেও অস্পষ্ট ছিল। আদালতের রায়ে যদি ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে হয়, তাহলে সংগৃহীত শুল্কের সবটুকুই ফেরত দানে হবে না—কিছু অংশই আমদানিকারকদের ফেরত দেওয়া হতে পারে বলে আগে অর্থনীতিবিষয়ক এক দফতরের মন্তব্য ছিল।
শ্রমবাজারের ক্ষেত্রেও ট্রাম্পের উপস্থাপনা সম্পূর্ণ সঠিক নয়। সরকারিভাবে ২০২৫ সালে প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার সরকারি কর্মচারী ছাঁটাই করা হয়েছে—তবে ট্রাম্প যে দাবি করেন উক্ত কর্মীরা ‘‘বেসরকারি খাতে সহজে কাজ পাচ্ছেন না’’—এ ব্যাপারে সরকারি চাকরি সৃষ্টির ছবি ভিন্ন। বিএলএস-এর তথ্য দেখায় ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে মোট মাত্র ৫ লাখ ৮৪ হাজার নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে বাইডেন প্রশাসনের শেষ বছরে এ সংখ্যা প্রায় ২০ লাখের কাছাকাছি ছিল। গাড়ি কারখানা ও সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগের বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা ট্রাম্পের কিছু দাবি অতিরঞ্জিত বলে আখ্যা দিয়েছেন।
অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে যে পরিবহন সরঞ্জাম খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে—প্রতিবেদন অনুযায়ী তা ১ হাজার ৪৪০ কোটি ডলারে নেমে গেছে। তদুপরি গ্যাসের গড় দাম নিয়েও ট্রাম্পের দাবি নির্ভুল নয়; বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসের গড় দাম গ্যালন প্রতি প্রায় ২.৮২ ডলার, যা ট্রাম্পের উল্লেখিত ১.৯৯ ডলারের থেকে অনেকটাই বেশি।
সংক্ষেপে, আল-জাজিরার যাচাই মতে ট্রাম্পের বক্তৃতায় উঠে আসা বেশিরভাগ অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান সরকারি নথি ও স্বাধীন বিশ্লেষণের সঙ্গে মেলে না বা অতিরঞ্জিত। প্রতিবেদনে বিশদ উদাহরণ ও সরকারি সূত্র দেখিয়ে এ দাবি সমর্থিত হয়েছে।
(সূত্র: আল জাজিরা)
আজকালের খবর/ এমকে

