ভারত এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) মধ্যকার দীর্ঘ প্রতীক্ষার পরিশেষে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) চূড়ান্তভাবে ঘোষণা করা হতে পারে। সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, এই ঘোষণা নির্ধারিত হতে পারে আগামী ২৫ থেকে ২৮ জানুয়ারি ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা ও ইউরোপীয় কমিশনের সভাপতি উরসুলা ভন ডার লিয়েনের ভারত সফরের সময় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে।
চুক্তি কার্যকর হলে ইউরোপীয় মদ ও গাড়ির ওপর আমদানি শুল্ক উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়ে যাবে, আর এর বিনিময়ে ভারতের তৈরি পোশাক, গয়না, ইলেকট্রনিক্স ও রাসায়নিক পণ্যের জন্য ইউরোপিয়ান বাজার আরও বিস্তৃতভাবে উন্মুক্ত হবে—এটি ভারতের রপ্তানিকে বড় মাত্রায় সহায়তা করবে।
পরিস্থিতির গুরুত্ব প্রদর্শন করে জানানো হচ্ছে, বাণিজ্যিক দিকের পাশাপাশি ভারত ও ইইউ একটি নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব ঘোষণা করতেও এগোচ্ছে। ইইউ ইতোমধ্যেই দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত হয়েছে; বাস্তবে এই অংশীদারিত্বের মধ্যে ভারত তৃতীয় এশীয় দেশ হবে। সঙ্গে উচ্চদক্ষ কর্মী ও শিক্ষার্থীদের চলাচলের সুবিধার্থে একটি ‘মবিলিটি অ্যাগ্রিমেন্ট’ স্বাক্ষরের সম্ভাবনাও রয়েছে।
ভূগোলগত ও অর্থনৈতিক হিসেবে এই চুক্তির গুরুত্ব উজ্জ্বল—২০২৪–২৫ অর্থবছরে ভারত ও ইইউর দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১৩৬.৫ বিলিয়ন ডলার, যা ইইউকে ভারতের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে উপস্থাপন করে। তবে চুক্তি ঘোষণার পর এটিকে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে অনুমোদনের জন্য অন্তত এক বছর সময় লাগতে পারে বলে বলা হচ্ছে।
চুক্তির আলোচনায় এখনও কিছু স্পর্শকাতর বিষয় বাকি আছে। ডাভোসে উরসুলা ভন ডার লিয়েন মন্তব্য করেছেন, চুক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে থাকলেও গাড়ি আমদানির ক্ষেত্রে ভারতের উচ্চ শুল্ক হ্রাস নিয়ে এখনো দরকষাকষি চলছে। শুল্ক কমার পর ফক্সওয়াগন বা রেনল্টের মতো ইউরোপীয় নির্মাতারা ভারতের বাজারে আরও শক্ত অবস্থানে আসতে পারবে।
একই সঙ্গে নয়াদিল্লি ‘নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার’ নিয়ে উদ্বিগ্ন—ইইউর কার্বন সীমা সংক্রান্ত নতুন করনীতি এবং ভারতের জন্য কিছু বিশেষ শুল্ক সুবিধা (জিএসপি) প্রত্যাহারের সম্ভাব্য প্রভাবের প্রতি সতর্ক। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, জিএসপি স্থগিত হলে ভারতের প্রায় ১.৯৫ বিলিয়ন ডলারের মতো রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যা কাটিয়ে ওঠার জন্য মুক্তবাণিজ্য চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ হবে।
বিষয়টি নিয়ে থিঙ্ক ট্যাঙ্ক গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের প্রতিষ্ঠাতা অজয় শ্রীবাস্তব মনে করেন, চুক্তি কার্যকর হলে ভারতের তৈরি পোশাক ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি বাড়বে এবং বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামসহ প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিতে ভারত আরও সক্ষম হবে।
বিশ্ব বাণিজ্যে বর্তমান অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে—বিশেষ করে বড় বাজারগুলোতে নীতিগত পরিবর্তনকে সামনে রেখে—ভারত বিকল্প বাজার ও পার্টনারশিপ সক্রিয়ভাবে খুঁজছে। এই এফটিএ দেশটির জন্য কৌশলগত ও অর্থনৈতিকভাবে বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে, তবে চূড়ান্ত অনুমোদন ও বাস্তবায়নের পথে এখনও কয়েকটি জটিল আলোচনা বাকি আছে।
সূত্র: রয়টার্স
(প্রস্তুত করেছে: আজকের খবর / এমকে)

