অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে সরকারি ব্যয় কমিয়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তবে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে সেই ঘোষণার উল্টো পথে একে একে পরিচালন খাতের ব্যয় বাড়ানো হয়েছে—ফলে রাজস্ব ঘাটতি ও বাজেট চাপে অভিযোগ বাড়ছে।
উল্লেখযোগ্য অসামঞ্জস্য
সরকারি ঘোষণার বিপরীতে কাগজে থাকা সংযম বাস্তবে রূপ নেয়নি—পরিচালন ব্যয়ে ধারাবাহিক বাড়তি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গত অর্থবছরের হিসাব বলছে, প্রথমবারের মতো সরকারের পরিচালন ব্যয় মোট রাজস্ব আয়কে ছাড়িয়ে গেছে। দেশের রাজস্ব আয় বড় পরিমাণে কম থাকার পরও পরিচালন ব্যয় দ্রুত বেড়েছে, যা অর্থনীতিবিদদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
বড় চালিকা শক্তি: বেতন-ভাতা ও ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি
পে কমিশনের সর্বশেষ প্রস্তাবে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও পেনশন সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। সেই প্রস্তাব বাস্তবায়নে বছরে প্রয়োজন হবে প্রায় ১ লক্ষ ৬ হাজার কোটি টাকা। যদিও এটি তিন বছরে ধাপে ধাপে দেওয়া হতে পারে, তবু বছরে গড়ে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত জোগান লাগবে—যা দেশের রাজস্ব আয়কে কয়েক মাস পিছিয়ে দিতে সমান মাপের বোঝা।
পাশাপাশি ভূতাপেক্ষ পদোন্নতিও পরিচালন ব্যয়ের বড় চাপ সৃষ্টি করেছে। গত বছরে প্রায় ৭৬৪ জন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে বিভিন্ন পর্যায়ে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দেওয়া হয়; তার মধ্যে ১১৯ জন সচিব পদে উন্নীত হন। অন্য ক্যাডারের আরও অনেকে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে—এর ফলে সরকারি ক্ষতিপূরণ ও পেনশন খাতের স্থায়ী বাড়তি দায় সৃষ্টি হয়েছে।
ভাতা-বৃদ্ধি ও অন্যান্য সংগ্রহশীল সিদ্ধান্ত
গ্রেডভিত্তিক বিশেষ আর্থিক সুবিধা, প্রশিক্ষণ ভাতা দ্বিগুণ করা, প্রশিক্ষকদের ভাতা সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত নির্ধারণ, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের ভাতা ২০–৪২ শতাংশ বাড়ানোসহ বিভিন্ন ভাতা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পুলিশ সদস্যদের ঝুঁকিভাতা ২০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে এবং গ্রাম পুলিশের বেতন ও অবসরকালীন ভাতা বৃদ্ধি পূর্বাভাসিত অতিরিক্ত ব্যয়ের মধ্যে পরিণত হয়েছে। কূটনৈতিক মিশনের বৈদেশিক ভাতাও বৃদ্ধি পেয়ে বার্ষিক সাশ্রয়হীন ব্যয় বেড়েছে।
নতুন দায়িত্বপালকদের জন্য অবকাঠামো ও যানবাহন
রাজস্ব সংকটের মধ্যে মন্ত্রীপাড়ায় ৭২টি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট নির্মাণে প্রায় ৭৮৬ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ ছাড়া সরকারি যানবাহন কেনার সীমাও তিন দফায় বাড়ানো হয়েছে—এসি মিনিবাস, প্রাইভেট কার, জিপ, ট্রাক ও মোটরসাইকেল পর্যন্ত। নির্বাচনকালীন দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের জন্য গাড়ি কেনার প্রস্তাব ও ক্রয়ের সিদ্ধান্তও বহাল রাখা হয়েছে, ফলে চলতি ও ভবিষ্যৎ বছরের পরিচালন ব্যয়ে চাপ বাড়বে।
শিক্ষা খাতে এমপিওভুক্তি ও পুনরাবৃত্তি ব্যয়
অন্তর্বর্তী সরকার মাদ্রাসা শিক্ষার প্রসারে চলতি অর্থবছরে সারাদেশে ১ হাজার ৫১৯টি মাদ্রাসাকে এমপিওভুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে এমপিওভুক্ত হয়েছে; বাকি প্রক্রিয়াধীন। এতে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন, ভাতা, ভাড়া-খরচ ও চিকিৎসা ভাতাসহ নিয়মানুগ পরিশোধ থেকে পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে।
বাজেটে স্থানান্তর: উন্নয়ন ব্যয় কমে পরিচালন বেড়েছে
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে মোট আয়-ব্যয়ের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে: বাজেট ঘোষণায় পরিচালন ব্যয়ের বরাদ্দ মোট মিলিয়ে ২৮ হাজার কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে, আর উন্নয়ন ব্যয় থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকার কাটা হয়েছে। শুধু সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদই সংরক্ষিত অতিরিক্ত অনুদান প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা। সরকারের নিজের রিপোর্ট অনুযায়ী চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে পরিচালন খাতে ব্যয় মোট বাজেটের ১১.৪৭ শতাংশ, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে।
রাজস্ব ঘাটতির চিত্র
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরের চূড়ান্ত হিসাবেও রাজস্ব আদায় পরিচালন ব্যয় পূরণে যথেষ্ট ছিল না—রাজস্ব আয়কে ছাড়িয়ে পরিচালন ব্যয় ছিল প্রায় সাড়ে ৩৫ হাজার কোটি টাকা।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ
অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আর্থিক বিশ্লেষণ ও সংস্থান পরিকল্পনা থাকতে হয়; সরকারও জানে কীভাবে অর্থ জোগান দিতে হয়। সাবেক অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, সাধারণত রাজস্ব আয় দিয়েই পরিচালন ব্যয় মেটানো হয়; বর্তমানে সেই সমতা বজায় না থাকা উদ্বেগজনক এবং উন্নয়ন-বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বিআইডিএস-এর সাবেক মহাপরিচালক কে এ এস মুরশিদ বলেন, রাজস্ব বাড়ানো না করে অযৌক্তিকভাবে পরিচালন ব্যয় বাড়ানো ঠিক নয়—এ ধরনের ব্যবস্থাপনা আর্থিক সঙ্কট বাড়াতে পারে। সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান মন্তব্য করেন, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে ব্যয় কমানোর কথা বললেও বাস্তবে নির্বাচনী ও রাজনৈতিক সুবিধার মতো আচরণ দেখা যাচ্ছে; এটি একটি অরাজনৈতিক সরকারের উচিত নয়।
কথায়-প্রকৃতির ফারাক ঘুরিয়ে দাঁড় করানোর প্রয়োজন
অর্থনীতিবিদরা বলছেন—অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখতে হলে রাজস্ব জোগান বাড়ানো, অপ্রয়োজনীয় পরিচালন ব্যয় কন্ট্রোল করা এবং উন্নয়ন ব্যয়ে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। নয়তো বর্তমান প্রক্রিয়া জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এবং অর্থনৈতিক ঝুঁকি বাড়াবে।

