জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান আল জাজিরার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে দলের সর্বোচ্চ পদে কোনো নারী কখনো দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। তিনি তাতে যুক্তি দিয়েছেন যে এটি সৃষ্টিগত ও ধর্মীয় দিক থেকে সম্ভব নয়। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন আল জাজিরার সাংবাদিক শ্রীনিবাসন জৈন।
সর্বাত্মক মন্তব্য ও নির্বাচনী প্রেক্ষাপট
সাক্ষাৎকারে ডা. শফিকুর বলেন, দল দেশের আইনের শর্তে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে এবং জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু করা হবে না। খবরের শুরুর দিকে চলা বিতর্কের প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, দলের কৌশল ও নীতি নির্ধারণে দলের প্রধানের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ইসলামী মূল্যবোধ—দুর্নীতিবিরোধিতা, স্বচ্ছতা, গণতান্ত্রিক অধিকার ও মানবাধিকারের রক্ষা—এগুলো দল প্রচার করে বলেও উল্লেখ করেছেন।
ইসলামী আইন প্রয়োগ বিষয়ে তিনি বলেন সংসদ বিষয়টি সিদ্ধান্ত নেবে; ব্যক্তিস্বার্থে নয়, দেশের উন্নতির প্রয়োজন বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত হবে। নিজে একা এই সিদ্ধান্ত নেবেন না, এটা সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার বিষয় বলে দাবি করেছেন।
নারীর কর্মঘণ্টা ও মাতৃত্বকাল
সাংবাদিকের অভিযোগ অনুসারে জামায়াত আগে নারীদের কর্মঘণ্টা কমানোর প্রস্তাব দিয়েছে—তাতে তিনি প্রথমে অস্বীকার করেন, পরে বলেন তিনি শুধু বলেছিলেন মাতৃত্বকালীন সময়ে একটি বিশেষ সম্মান থাকা উচিত। তিনি যুক্তি দেন যে কোনো মা একযোগে সন্তান ধারণ, লালন ও পুরুষদের মতো কাজ করা একসঙ্গে সমানভাবে করতে পারা ন্যায়সংগত নয়; বিশেষত স্তন্যদানকালীন সময়ে মেয়েদের সম্মান জানানো উচিত।
পোশাকশিল্প পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, বেশ কয়েকটি কারখানা পরিদর্শন করার পর নারীরা সেখানে স্বস্তি পেয়েছেন এবং একেবারে চাকরি ছেড়ে যাওয়ার প্রবণতা কমে আসছে; কিন্তু প্রধানত তিনি বললেন মাতৃত্বকালীন ছয় মাসের ছুটি পর্যাপ্ত নয়—এই সময় বাড়াতে চান।
নারী প্রার্থী না দেওয়ার বিষয়
আগামী সংসদ নির্বাচনে জামায়াত কোনো নারী প্রার্থী নেবেন কি না, সাংবাদিক প্রশ্ন করলে ডা. শফিকুর জানান এ নির্বাচনে একজনও নারী প্রার্থী নেয়া হয়নি। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন দল নারীদের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে; স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে নারীরা অংশ নিয়ে সফলতা পেয়েছে এবং ভবিষ্যতে জাতীয় নির্বাচনে তাদের অংশগ্রহণের জন্য প্রস্তুতি চলবে। তিনি পুনরাবৃত্তি করে বলেন দল কখনোই নারীদের প্রতি অসম্মান দেখায় না।
জামায়াতের প্রধান পদে নারী পারবেন না
সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে বিতর্কিত অংশে তিনি বলেন জামায়াতের প্রধান পদে নারী সম্ভব নয়। তিনি বলেছেন, নারী-পুরুষের মধ্যে আলাদা সত্তা ও দায়িত্ব আছে এবং আল্লাহ যা সৃষ্টি করেছেন তা পরিবর্তন করা যাবে না; সন্তান জন্মদান ও স্তন্যপান যেমন শুধুই নারীর দায়িত্বই হওয়ায় সে ধরনের সীমাবদ্ধতা আছে—তাই কোনো নারী কখনো দলের আমির হতে পারবেন না, তার ভাষ্য। সাংবাদিক এতে প্রশ্ন তোলেন যে অনেক দেশে, এমনকি বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী নারী থেকেছেন—তা সত্ত্বেও তিনি ঘটনার উপলব্ধি নিয়ে আবারো নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করেন।
ছাত্র-সংগঠন, মিডিয়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান
সাক্ষাৎকারে ছাত্রনেতাদের উসকানিমূলক বক্তব্য ও কিছু সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ক্ষোভ তুলে ধরা নিয়ো প্রশ্নও আসে। ডা. শফিকুর বলেন, যদি কোনো জামায়াত ছাত্রনেতা বা ছাত্রশিবির সদস্য অবাঞ্চিত বা নির্যাতনাত্মক বক্তব্য প্রদান করে থাকে, সেটা দলের আনুষ্ঠানিক অবস্থান নয় এবং দল ইতোমধ্যেই নিন্দা জানিয়েছে। তিনি বলেন এটা ইসলামী ছাত্রশিবিরের বিষয়; নির্দিষ্ট ব্যবস্থা প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট সংগঠন কর্তৃক বিষয়টি দেখা হবে।
সংখ্যালঘু নিরাপত্তা ও ২০০১–২০০৬ সালের হামলার অভিযোগ
সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার অভিযোগ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার রিপোর্ট সম্পর্কে তিনি অস্বীকার পোষণ করেন। ২০০১–২০০৬ সালে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর ঘটেছিল এমন হামলার যে অভিযোগ আছে, জামায়াত তা প্রত্যাখ্যান করেছে এবং বলেন এমন অভিযোগ প্রমাণিত হলে নির্দিষ্ট নাম বললে তারা ব্যবস্থা নেবে। তিনি জানান, কেউ যদি জড়িত থাকে তা প্রমাণিত হোক, তখনই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
১৯৭১ সালের ভূমিকা ও যুদ্ধাপরাধের প্রশ্ন
সাক্ষাৎকারে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় জামায়াতের ভূমিকা সংক্রান্ত কঠোর প্রশ্নের মুখোমুখি হন তিনি। এ সময়ের ঘটনার বিষয়ে তিনি বলেন, তখনকার সিদ্ধান্তগুলো ছিল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত; তারা কোনও সশস্ত্র বাহিনী ছিল না। বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে তিনি তা ‘বিতর্কিত’ ও ‘রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত’ বলে অভিহিত করেছেন ও বলেছেন যে অনেক রায়কে তিনি ন্যায়বিচারের ব্যর্থতা হিসেবে দেখেন। একই সঙ্গে ১৯৪৭ সাল থেকে যদি কোনো ভুল হয়ে থাকে তার জন্য তিনি ব্যক্তিগত বা সংগঠনের পক্ষ থেকে অনুতপ্তি ও ক্ষমা চাওয়ার কথাও উল্লেখ করেছেন, যদিও ১৯৭১ সালের নৃশংসতা ও যুদ্ধাপরাধ আলাদা বিষয় হিসেবে থাকা উচিত বলে বলেছেন।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক প্রসঙ্গেও তিনি সংলাপের উপর গুরুত্ব আরোপ করেন। বলেন দুই দেশের সম্পর্ক ‘ভ্রাতৃত্বপূর্ণ, বন্ধুত্বপূর্ণ ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে’ থাকতে হবে এবং কোনো সমস্যা হলে সংলাপের মাধ্যমে সমাধান হবে। ভারতের কূটনীতিকের সঙ্গে তাঁর সাম্প্রতিক সাক্ষাতের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন এটি রাজনৈতিক বৈঠক ছিল না, কনিষ্ঠ পারিবারিক সাক্ষাৎ ছিল।
তরুণ ভোটার ও জামায়াতের ভবিষ্যৎ
সাক্ষাৎকারের শেষ পর্যায়ে তিনি তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা নিয়ে বলেন যে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের ভালো ফল তাদের পক্ষে হয়েছে এবং এটি দেখায় যে তরুণদের অনেকে তাদের বক্তব্যে সমর্থন জানাচ্ছেন। তিনি বলেন জনগণই শেষ সিদ্ধান্ত নেবে যে জামায়াত দেশকে কতটা পরিবর্তন আনতে পারবে।
সাক্ষাৎকারটি আল জাজিরার শ্রীনিবাসন জৈন করেছে। ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্যে নারীর ক্ষমতায়ন, ১৯৭১ সাল এবং সংখ্যালঘু নিরাপত্তা নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি রয়েছে তা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক পারফরম্যান্স ও জনমতের ওপর প্রভাব ফেলবে—বিশেষত যুব সমর্থন ও নারীর অংশগ্রহণ সংক্রান্ত ইস্যুগুলো বাংলাদেশে চলমান প্রধান বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।

