ওয়াশিংটনভিত্তিক আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল বাংলাদেশদের পক্ষেই রায় দিয়েছেন; কানাডার কোম্পানি নাইকোকে ৪ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার (প্রায় ৫১৬ কোটি টাকা) ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এই সিদ্ধান্ত দিয়েছেন ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর সেটেলমেন্ট অব ইনভেস্টমেন্ট ডিসপিউটস (ইকসিড)। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজানুর রহমান বৃহস্পতিবার এ রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
ট্রাইব্যুনালের নির্দেশে বলা হয়েছে, প্রায় ৮ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পুড়ে যাওয়ার ক্ষতিপূরণ হিসেবে নাইকোকে ৪০ মিলিয়ন ডলার এবং পরিবেশ ও অন্যান্য ক্ষতির জন্য আরও ২ মিলিয়ন ডলার দিতে হবে।
টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রটি ১৯৫৯ সালে আবিষ্কৃত হয়। পরবর্তী বছর কূপ খননের মাধ্যমে ১১০০ মিটার থেকে প্রায় ১৯৭৫ মিটারের গভীরে নয়টি গ্যাস স্তর শনাক্ত করা হয়। এখান থেকে উত্তোলিত গ্যাস ছাতকের সিমেন্ট কারখানা ও কাগজ মিলসহ স্থানীয় শিল্পে সরবরাহ করা হতো। প্রায় ২৬.৪৬ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলনের পর কূপে পানি উঠে আসায় তা বন্ধ করা হয়েছিল। দীর্ঘদিন বাতিল থাকার পর ২০০৩ সালে গ্যাস অনুসন্ধান ও উন্নয়নের জন্য এই ক্ষেত্র নাইকোর কাছে হস্তান্তর করা হয়।
খননকাজ শুরুর পর ২০০৫ সালের ৭ জানুয়ারি ও ২৪ জুন টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে পরপর দুটি ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণের ফলে মজুদ গ্যাস জ্বলে যাওয়ার পাশাপাশি আশপাশের স্থাপনা ও সম্পদ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ঘটনায় পেট্রোবাংলা নাইকোর কাছে ৭৪৬ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করে; কিন্তু কোম্পানিটি তা দান অস্বীকার করে।
২০০৭ সালে পেট্রোবাংলা স্থানীয় নিম্ন আদালতে মামলা করে এবং একই সময়ে নাইকোর ফেনী গ্যাসক্ষেত্রের গ্যাস বিল পরিশোধ বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে হাইকোর্ট নাইকোর বাংলাদেশে থাকা সম্পদ বাজেয়াপ্ত এবং সংশ্লিষ্ট চুক্তি বাতিলের নির্দেশ দেন। বিষয়টি সুপ্রীম কোর্টে গেলে সেখানেও বাংলাদেশের পক্ষে রায় আসে।
তবে নাইকো আটকে রাখা গ্যাস বিল ও ক্ষতিপূরণ দাবির জন্য ২০১০ সালে ইকসিডে দুইটি মামলা করে। ওই প্রক্রিয়ার একটি রায়ে ২০১৪ সালে ইকসিড পেট্রোবাংলাকে ফেনী গ্যাসক্ষেত্রের পাওনা পরিশোধের নির্দেশ দেয়। পরে ২০১৬ সালে তেল-গ্যাস উৎপাদন সংস্থা বাপেক্স নাইকোর বিরুদ্ধে প্রায় ৯ হাজার ২৫০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করে ইকসিডে মামলা করে, যার চূড়ান্ত আদেশে ক্ষতিপূরণের নির্দেশ আসে।
আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের রায়ে বলা হয়েছে, নাইকোই খননকাজের তত্ত্বাবধান ও ব্যবস্থাপনা করছিল। আন্তর্জাতিক পেট্রোলিয়াম শিল্পের মানদণ্ড অনুসরণে ব্যর্থ হওয়া এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন না করার কারণে বিস্ফোরণ ঘটেছে; তাই নাইকো সরাসরি দায়ী।
টেংরাটিলা ক্ষেত্রটি ছাতক পূর্ব ও ছাতক পশ্চিম—দুই অংশে বিভক্ত। অগ্নিকাণ্ডে ছাতক পশ্চিম অংশের এক স্তরের গ্যাস পুড়ে গেলেও অন্যান্য স্তর এবং ছাতক পূর্ব অংশের গ্যাস মজুদ অক্ষত রয়েছে। এই খননে সম্ভাব্য মজুদের পরিমাণ প্রায় ২ থেকে ৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট বলে ধারণা করা হয়।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান রেজানুর রহমান বলেন, ছাতক গ্যাসক্ষেত্রে নতুন কূপ খননের জন্য উন্নয়ন প্রকল্পের (ডিপিপি) খসড়া প্রস্তুত রয়েছে। ইকসিডের চূড়ান্ত রায়ের পর আইনজীবীদের পরামর্শ নিয়ে দ্রুত পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
সূত্র: আজকালের খবর/ এমকে

