ওয়াশিংটনভিত্তিক আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর সেটেলমেন্ট অব ইনভেস্টমেন্ট ডিসপিউটস (ইকসিড) সুনামগঞ্জের ছাতকের টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে ২০০৫ সালের বিস্ফোরণ সংক্রান্ত মামলায় বাংলাদেশের পক্ষে রায় দিয়েছে। রায়ে কানাডার কোম্পানি নাইকোকে ৪ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার (প্রায় ৫১৬ কোটি টাকা) ক্ষতিপূরণ দিতে নির্দেশ করা হয়েছে। এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজানুর রহমান।
ইকসিডের সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, টেংরাটিলা ক্ষেত্র থেকে প্রায় ৮ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পুড়ে যাওয়ার ক্ষতির জন্য কিছু অংশ হিসেবে ৪০ মিলিয়ন ডলার এবং পরিবেশসহ অন্যান্য ক্ষতির ক্ষতিপূরণ হিসেবে আরও ২ মিলিয়ন ডলার অর্থাৎ মোট ৪২ মিলিয়ন ডলার দিতে হবে নাইকোকে।
টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রটি ১৯৫৯ সালে আবিষ্কৃত এবং ১৯৬০ সালে কূপ খননের মাধ্যমে ১ হাজার ৯০ মিটার থেকে ১ হাজার ৯৭৫ মিটারের মধ্যে নগ্নভাবে ৯টি গ্যাসস্তর শনাক্ত করা হয়। সেখান থেকে উত্তোলিত গ্যাস ছাতকের সিমেন্ট ও পেপার মিলকে সরবরাহ করা হতো। পরবর্তী সময়ে প্রায় ২৬.৪৬ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলনের পর পানি উঠে আসায় কূপটি বন্ধ করা হয়। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর ২০০৩ সালে গ্যাস অনুসন্ধান ও উন্নয়নের জন্য ক্ষেত্রটি নাইকোর কাছে হস্তান্তর করা হয়।
খননকাজ শুরু হওয়ার পর ২০০৫ সালের ৭ জানুয়ারি এবং ২৪ জুন দুটি পরপর ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণের ফলে মজুত গ্যাস পুড়ে যায় এবং আশপাশের স্থাপনা ও সম্পদে ব্যাপক নক্ষত্রণ হয়। পেট্রোবাংলা তখন নাইকোর কাছে ৭৪৬ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণের দাবি করে। নাইকো তা অস্বীকার করলে ২০০৭ সালে পেট্রোবাংলা স্থানীয় আদালতে মামলা দায়ের করে এবং পরে ফেনী গ্যাসক্ষেত্রে নাইকোর পাওনা বিল পরিশোধ স্থগিত রাখা হয়।
পরবর্তীতে হাইকোর্ট বাংলাদেশে থাকা নাইকোর সব সম্পদ বাজেয়াপ্ত ও সম্পাদিত চুক্তি বাতিলের নির্দেশ দেন। বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টে গেলে সেখান থেকেও বাংলাদেশের পক্ষে রায় আসে। নাইকো আটকে রাখা বিল ও ক্ষতিপূরণ না দেওয়ার অভিযোগের প্রতিশোধ হিসেবে ২০১০ সালে ইকসিডে দুটি মামলা করে। এর মধ্যে ২০১৪ সালের এক রায়ে ইকসিড পেট্রোবাংলাকে ফেনী গ্যাসক্ষেত্রের পাওনা পরিশোধের নির্দেশ দেয়।
২০১৬ সালে তেল-গ্যাস উৎপাদনের সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি (বাপেক্স) নাইকোর বিরুদ্ধে প্রায় ৯ হাজার ২৫০ কোটি টাকা (প্রায় ১১৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) ক্ষতিপূরণের দাবি ইকসিডে দায়ের করে। পরের সময় এই মামলার চূড়ান্ত আদেশে ক্ষতিপূরণের নির্দেশ আসে।
আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে, খননকাজ নাইকোর তত্ত্বাবধান ও ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হচ্ছিল এবং তারা আন্তর্জাতিক পেট্রোলিয়াম শিল্পের মানদণ্ড অনুসরণে ব্যর্থ হয়। প্রয়োজনীয় সতর্কতা না নেওয়ার কারণে এই বিস্ফোরণ সংঘটিত হয়েছে, ফলে নাইকো সরাসরি দায়ী বলে ট্রাইব্যুনাল প্রতিপন্ন করেছে।
টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রটি ছাতক পূর্ব এবং ছাতক পশ্চিম (টেংরাটিলা) নামে দুই ভাগে বিভক্ত। আগুনে ছাতক পশ্চিমের একটি স্তরের গ্যাস পুড়ে গেলেও অন্যান্য স্তর এবং ছাতক পূর্ব অংশের মজুত গ্যাস অক্ষত রয়েছে। এই ক্ষেত্রের সম্ভাব্য মজুত পরিমাণ ২ থেকে ৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট হিসেবে অনুমান করা হয়।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান রেজানুর রহমান বলেন, ছাতক গ্যাসক্ষেত্রে নতুন কূপ খননের জন্য উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রস্তুত আছে। তারা ইকসিডের চূড়ান্ত রায়ের অপেক্ষায় ছিল এবং এখন আইনজীবীদের পরামর্শ নিয়ে দ্রুত পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে।
সংবাদসূত্র: আজকালের খবর/ এমকে

