আজ ৩০ জানুয়ারি—বাংলাদেশের সাহিত্য, চলচ্চিত্র ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক শোকাবহ ও গৌরবোজ্জ্বল দিন হিসেবে স্মরণ করা হল প্রয়াত লেখক ও চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানকে। ১৯৭২ সালে মিরপুরের মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী শেষ রণাঙ্গনে নিখোঁজ হয়ে শহীদ হন তিনি। তাঁর স্মরণে আয়োজিত আবেগঘন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন তাঁর ছেলে তপু রায়হান।
শ্রদ্ধানুষ্ঠান কেবল অতীতের স্মৃতিচারণেই সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি একধরনের ইতিহাসচেতনা ও ভবিষ্যৎ প্রত্যাশার ময়দান হিসেবেও পরিবেশন করে। সম্মেলনকক্ষে শহীদ জহির রায়হানের সাংস্কৃতিক অবদানের প্রতি সম্মান জানিয়ে প্রদর্শন করা হয় তাঁর খ্যাতনামা প্রামাণ্যচিত্র ‘স্টপ জেনোসাইড’—যেটি আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে পড়ে আছে।
অনুষ্ঠানে জহির রায়হান পরিবারের সদস্য, শুভানুধ্যায়ী, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী নানা শ্রেণি–পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন। স্মৃতিচারণ, বক্তৃতা ও চিত্রপ্রদর্শনীর মাধ্যমে তাঁর জীবন ও কাজের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানে একান্তভাবে আলোচ্যবিষয় ছিল তপু রায়হানের সামগ্রিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্তও। তিনি আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৭ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন—এবং সেই সিদ্ধান্তকে তিনি বর্ণনা করেছেন ‘‘উত্তরাধিকার নয়, চেতনার দায়’’ হিসেবে। সাংবাদিকদের কাছে তিনি বলেন, তাঁর বাবা সরাসরি রাজনীতি না করলেও লেখায় ও চলচ্চিত্রে রাজনৈতিক চেতনার গভীর প্রভাব ছিল; তিনি সেই চেতনায় বিশ্বাসী হয়ে জনগণের পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তপু রায়হান স্পষ্ট করেন, তিনি নিজেকে কেবল ‘‘লিজেন্ডের সন্তান’’ হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখতে চান না; একজন সচেতন নাগরিক ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ থেকেই তিনি রাজনীতিতে এসেছেন। তিনি বলেন, ঢাকা-১৭ এলাকায় গুলশান ও বনানীর মতো অভিজাত এলাকা থাকলেও কড়াইল বস্তির মতো অবহেলিত জনপদও রয়েছে; স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও মৌলিক সেবার বিচারের মধ্যে এখানকার সাধারণ মানুষ পিছিয়ে আছে। নির্বাচিত হলে তিনি এই বৈষম্য দূর করে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে কাজ করবেন—এটাই তাঁর প্রতিশ্রুতি।
তপু রায়হান জোর দিয়ে বলেন, তাঁর রাজনীতি ক্ষমতা অর্জনের জন্য নয়, মানুষের সঙ্গে থেকে মানুষের কল্যাণে কাজ করার জন্য। তিনি রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা শেষে জিতুক বা হোক না কেন—অবিরতভাবে মানুষের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন। পাশাপাশি তিনি জানিয়েছেন, নির্বাচনে জিতলেও বা পরাজিত হলেও এলাকার উন্নয়নের স্বার্থে বিজয়ী প্রার্থীর সঙ্গে মিলেই কাজ করতে তিনি প্রস্তুত; এই মনোভাবটি অনেকের কাছে বর্তমান রাজনীতির বাইরে গিয়ে দায়িত্ববোধ ও সহযোগিতার একটি অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে ধরা পড়ছে।
শহীদ জহির রায়হানের স্মরণে আয়োজিত অনুষ্ঠান তাই শুধু অতীতের প্রতি শ্রদ্ধা নয়; এটি ভবিষ্যতের প্রতি একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক বার্তাও দিচ্ছে। একজন শহীদের সন্তান হিসেবে নয়—একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে তপু রায়হানের আত্মপ্রকাশ ঢাক-১৭ আসনের রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। যদি উত্তরসূরিরাও মানবতা, ন্যায় ও চেতনার রাজনীতিতে অটল থাকে, তবেই এই স্মরণদিনের সবচেয়ে বড় অর্জন হবে।
– শহিদুল ইসলাম খোকন
আজকালের খবর/বিএস
