বগুড়ার সোনাতলা উপজেলার নামাজখালী গ্রামের নিত্যঘোষ—যার জীবনের বড় অংশই ছিল দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তায়—আজ নিজ পায়ে দাঁড়িয়ে দই-মিষ্টি ও অন্যান্য দুগ্ধজাত পণ্য তৈরি করে সফল একজন উদ্যোক্তা।
প্রসঙ্গভিত্তিক আলাপে নিত্যঘোষ জানালেন, প্রায় ২৪–২৫ বছর আগে খরস্রোতা নদী তাদের গ্রাম কেড়ে নেয়। চোখের সামনে ভেসে যায় তাদের ঘরবাড়ি ও আসবাবপত্র। পরিবারের সদ্য অবস্থায় তিনি ও পরিবার সবাই ছেঁড়া কাপড়েই রানীরপাড়ায় চলে আসেন এবং অন্যের জমিতে সাময়িক মাথা গুঁজে বসতে বাধ্য হন।
অতিদরিদ্রতার দিনে নিকট আত্মীয়ের কাছ থেকে একটি গরু পাওয়া এবং ধারকরে কিছু দুধ কিনে দই বানিয়ে গ্রামে বিক্রি করাই ছিল তার আদি উপার্জন। সেই কষ্টের দিনে সামান্য আয় থেকে সঞ্চয় জমিয়ে পরিশ্রমে বাড়ি চালাতে থাকেন। ধীরে ধীরে বাছুর রোপন, ধারদেনায় কয়েকটি গরু ক্রয় ও সঠিক দেখভাল করে গরুর সংখ্যা বাড়তে থাকে।
অবশ্যই সময় ও পরিশ্রমে সাফল্য আসে—আজ তাঁর খামারে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ২০টি গরু আছে। খামার থেকেই আসে সিংহভাগ দুধ; প্রয়োজন মতো দুধ বাইরে থেকেও ক্রয় করেন। নিত্যঘোষ নিজের দুধ দিয়ে দই, খিরসা, ঘি ও রসমালাই তৈরি করে বাজারে পাঠান। সকালে কারখানায় গেলে দেখা যায় ক্রেতারা কাঁধে করে দই নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছেন, কেউ কার্টুনে খিরসা ভরছে—তবে তিনি এসব পণ্য পাইকারি মূল্যে বিক্রি করেন।
নিত্যঘোষ বলেন, তাঁর দুটি কারখানায় মোট ছয়টি বড় পাত্রে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪০০–৫০০টি ছোট কাপ, ৫০–৬০টি মাঝারি প্যাকেট (সরা) এবং ১০০–১৫০টি বড় বাটিতে দই ভরা হয়। স্ত্রী ও সন্তানসহ পরিবারের কয়েকজন নিয়মিত সহযোগিতা করেন।
তার উৎপাদিত দুগ্ধজাত পণ্য শুধু গ্রাম বা উপজেলা ঘেঁষেই থামছে না; উত্তরাঞ্চল থেকে শুরু করে ঢাকা পর্যন্ত সরবরাহ হচ্ছে। লালমনিরহার্ট, গাইবান্ধা, রংপুর, কুড়িগ্রাম, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়সহ বিভিন্ন জেলায় এবং ঢাকায় কয়েকটি হোটেলের সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক সরবরাহ চালান তিনি।
উৎপাদন ও বিক্রয়ের আয় এখন দশ থেকে বারোটি পরিবারের জীবিকা চালাচ্ছে। প্রতিদিন জমজমাট বেচাকেনার মধ্য দিয়ে অতীতের কষ্ট কাটিয়ে নিত্যঘোষ আজ একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী।
নিত্যঘোষের স্বপ্ন সরকারিকৃষ্ঠপোষকতা পেলে খামার বড় করা, দই তৈরির বড় কারখানা গড়ে তোলা এবং বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। তিনি জানালেন, যদি সহায়তা দেওয়া হয়, আরও লোককে কাজ দেবেন এবং অনেক পরিবারের জীবনমান বদলে যাবে।
দই কেনেন এমন একজন ক্রেতা ইলিয়াস আলী জানান, নিত্যঘোষের পণ্য গ্রামে পুনরায় বিক্রি করে তিনি সহজেই পাওনা পরিশোধ করছেন এবং মুনাফাও হয়।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ মোঃ মিজানুর রহমান বলেন, তিনি নিত্যঘোষের গাভীর খামার ও দই-মিষ্টি তৈরির কারখানা পরিদর্শন করেছেন। এধরনের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের উৎসাহ দিলে প্রাণিসম্পদের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব হবে।
নিত্যঘোষের সংগ্রাম ও সফলতা স্থানীয়দের জন্য অনুপ্রেরণার চিত্র—নদীবিপদ, ঘাটতির দিন পেরিয়ে এক নিখুঁত পরিকল্পনা ও পরিশ্রমের মিশ্রণে আজ তিনি নিজের এবং অনেক পরিবারের জীবনে আলো ফিরিয়েছেন।

