ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) জানিয়েছে যে ২০২৫ সালে দেশের রাজনৈতিক সহিংসতা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর সারাদেশে মোট ৪০১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় অন্তত ১০২ জন নিহত হয়েছেন এবং একই সময়ে ১,৩৩৩টি অস্ত্র নিখোঁজ দেখানো হয়েছে।
রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, তফসিল ঘোষণা হওয়ার পরবর্তী ৩৬ দিনের মধ্যেই অন্তত ১৫ জন রাজনৈতিক নেতা-কর্মী হত্যা হয়েছে, যা নির্বাচনি পরিবেশকে আরও অপরাধমূলক ও অস্থিতিশীল করে তুলেছে।
এসব তথ্য বুধবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কনফারেন্স রুমে আয়োজিত ‘কর্তৃত্ববাদ পতন-পরবর্তী দেড় বছর: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে তুলে ধরা হয়।
প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে থানা ছাড়ানো বিপুলসংখ্যক অস্ত্র উদ্ধার না করা এবং নতুন করে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের কাছে অস্ত্র লাইসেন্স প্রদানের ফলে সহিংসতার ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী মোট জনশক্তির মাত্র ৯–১০ শতাংশ পুলিশ হওয়ায় সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেই বড় ঘাটতি রয়েছে। এই সংকট নির্বাচনকালীন নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় ঝুঁকি তৈরি করছে বলে টিআইবি মূল্যায়ন করেছে।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর গত বছর ৫০টির বেশি হামলার ঘটনা সংঘটিত হয়েছে, যা নির্বাচনি পরিবেশ সম্পর্কে গভীর উদ্বেগের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিবেদনে ক্রমবর্ধমান ডিপফেক প্রযুক্তি এবং ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ার হুমকিকেও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
মাঠ প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়েও তদন্তে প্রশ্ন উঠে এসেছে। বিশেষ করে গত তিনটি নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তাদের হঠাৎ বদলি বা বাদ দেওয়া, উপদেষ্টাদের দলীয়করণ এবং প্রশাসনের পক্ষপাতিত্ব বিষয়ক সন্দেহ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। জামায়াত, এনসিপি ও ইসলামী আন্দোলনসহ কিছু দলের বিরুদ্ধে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত করা হয়নি—এমন অভিযোগ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
৪৬টি আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ সংক্রান্ত বিষয়ের কারণে উচ্চ আদালতে অন্তত ২৭টি রিট আবেদন করা হয়েছে। তদুপরি নির্বাচনী কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার হওয়া প্রায় ১২,৫৩১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্র হিসেবে অনুপযোগী বলে শনাক্ত করা হয়েছে, যা ভোট পরিচালনার সক্ষমতায় বড় বাধা।
ইলেকশন কমিশন কর্তৃক প্রাথমিকভাবে বাছাই করা ৭৩টি পর্যবেক্ষক সংস্থার মধ্যে অনেকে ‘নামসর্বস্ব’ বা সক্ষমতাহীন বলে প্রতিবেদনে উদ্বেগ জানানো হয়েছে। প্রার্থীর মনোনয়ন যাচাই-বাছাই, ঋণ খেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগে প্রার্থিতা বাতিলের ঘটনাসমূহে নির্বাচন কমিশনের পক্ষপাতিত্বের অভিযোগও উঠেছে। এছাড়া হলফনামায় দেওয়া তথ্য যাচাই করার সক্ষমতা নিয়েও কমিশনের ঘাটতি নির্দেশ করা হয়েছে।
টিআইবি তাদের পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে যে প্রতিটি বড় রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধেই আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। যদিও কিছু ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেয়া হলেও আচরণবিধি কার্যকরভাবে বাস্তবায়নে নির্বাচন কমিশনের শক্ত অবস্থানের ঘাটতি দেখা গেছে।
রিপোর্টে নির্বাচনের প্রযুক্তি, আইন ও প্রক্রিয়াগত খাতে ব্যাপক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা ওপর জোর দেয়া হয়েছে। নিরাপত্তার দুর্বলতা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ভুয়া বা বিভ্রান্তিমূলক তথ্য ছড়িয়ে পড়া—এসবই এখনো নির্বাচনের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
টিআইবি একই সঙ্গে কয়েকটি নীতিগত পদক্ষেপও সুপারিশ করেছে; তার মধ্যে রয়েছে অস্ত্র উদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া, অস্ত্র লাইসেন্স প্রদানে সতর্কতা, নির্বাচনী দায়িত্যে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত পুলিশ মোতায়েন, মাঠ প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা, অনুপযোগী ভোটকেন্দ্র শনাক্ত করে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া, পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর সক্ষমতা যাচাইতথ্য ভিত্তিকভাবে নিশ্চিত করা এবং ডিজিটাল মিথ্যাচার ও ডিপফেক মোকাবিলায় প্রযুক্তিগত সুরক্ষা বৃদ্ধি করা।
টিআইবি আশঙ্কা করছে যে এসব সমস্যা সমাধান না হলে আগামী নির্বাচন জটিলতা, সহিংসতা এবং তথ্যশূন্যতার কারণে স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতায় ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সূত্র: আজকালের খবর/ এমকে

