ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-২০২৬ উপলক্ষে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে শ্রমিক অধিকার সংক্রান্ত অঙ্গীকার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা ও জাতীয় পর্যায়ে শ্রমিক ইস্যুতে রাজনৈতিক অঙ্গীকার দৃঢ় করার লক্ষ্যে ‘শ্রমিক অধিকার জাতীয় এডভোকেসি এলায়েন্স’ সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে একটি আলোচনা আয়োজন করে। এ অনুষ্ঠানে শ্রম বিষয়ক একাডেমি, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, গবেষক ও বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী অংশ নেন। অনুষ্ঠানটি এলায়েন্স সচিবালয়, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস) ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)-এর সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত হয়।
আইএলও বাংলাদেশ কান্ট্রি ডিরেক্টর ম্যাক্স টুনন বলেন, শ্রমিক ইশতেহার ও শ্রম সংস্কার কমিশনের উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে অনুকূল শিল্প সম্পর্ক গড়ে উঠবে এবং শিল্প-বাণিজ্য ও আমদানি-রপ্তানিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তিনি বলেন, এ ধরনের সংস্কার শিল্পক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রেখে কর্মস্থলে স্থায়িত্ব আনবে।
মানবাধিকার কর্মী ও মানুষকে জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, শ্রমিক ইশতেহারের বাস্তবায়নকে নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে নিয়ে একটি সম্মিলিত দাবি গড়ে তোলার আহ্বান জানান, যাতে নির্বাচিত সরকার ইশতেহার বাস্তবায়নকে দায়িত্বশীলতাবশত গ্রহণ করে।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক এম এম আকাশ শ্রমিক ইশতেহারে মানবিক মর্যাদা, শোষণবিহীন কাজের পরিবেশ ও সুযোগের সমতা নিশ্চিত করার গুরুত্বে জোর দেন। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন—আগামী নির্বাচন শান্তিপূর্ণ না হলে এসব দাবি বাস্তবায়ন অসাধ্য হয়ে পড়বে। একই উদ্বেগ প্রকাশ করেন সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট সোহরাব হাসান; তিনি বলেন শ্রমিকদের মাঠে থাকতে হবে, কিন্তু যদি নির্বাচন সুষ্ঠু না হয় উদ্যোগগুলো অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
এলায়েন্সের সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক মেজবাহউদ্দীন আহমেদ বলেন, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, ন্যায্য মজুরি ও মর্যাদাপূর্ণ কাজের পরিবেশকে রাজনৈতিক অgen্ডায় স্থায়ীভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, নাগরিক সমাজকে নিয়মিতভাবে চাপ দিতে হবে যাতে যেকোনো নির্বাচিত সরকারই এ ইশতেহারকে নীরবতা বা অবহেলায় ফেলতে না পারে।
আওয়াজ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক নাজমা আক্তার বলেন, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা ও নারীর প্রতি বৈষম্য দূর না করলে শ্রমিক ইশতেহারের বাস্তবায়ন কখনোই সম্পূর্ণ হবেনা। নানাবিধ কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণকে ‘সহায়ক কাজ’ হিসেবে হালকাভাবে বিবেচনা না করে তাদের সমান অংশীদার হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে—এ কথা উল্লেখ করেন বিআইজিডির গবেষক মাহিন সুলতান।
নাগরিক উদ্যোগের নির্বাহী পরিচালক জাকির হোসেন বলেন, অপ্রাতিষ্ঠানিক সেক্টরের শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত না হলে ইশতেহারের বাস্তবায়ন আংশিকই থাকবে; শ্রমিকদের কেবল উৎপাদন উপকরণ হিসেবে না দেখে নীতিগত পরিবর্তন জরুরি। পরিবেশকর্মী শরীফ জামিল ন্যায্য রূপান্তর নিশ্চিত করার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর দর্শনগত অঙ্গীকার অপরিহার্য বলে মত প্রকাশ করেন।
গৃহশ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠা নেটওয়ার্কের সমন্বয়কারী আবুল হোসাইন বর্তমান রাজনৈতিক সহিংসতায় নারী অধিকারকর্মীদের ওপর আক্রমণের বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান। শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট আতিকুর রহমান বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো শ্রমিকদের নির্বাচনী সময় ‘ব্যাংক’ হিসেবে ব্যবহার করলেও নীতিনির্ধারণে তাদের অংশগ্রহণ থাকে না; নির্বাচনের পর শ্রমিক ইস্যুগুলো গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে—এ অবস্থা কাটাতে হবে এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামো ব্যবহার করে শ্রমিকদের ওপর দমনের নীতি বন্ধ করতে হবে।
অপর বক্তব্যকালে অর্থনীতিবিদ রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর দ্রব্যমূল্য ও মূল্যস্ফীতির সময়ে শ্রমিকদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন এবং বৃদ্ধ ও অবসরপ্রাপ্ত মানুষের সঞ্চয়-নিরাপত্তা বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। আইএলও ইআইআই প্রকল্পের জাতীয় সমন্বয়ক নওশিন শাহ, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব আবু সাইদ খান, ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের অর্থ সম্পাদক রুহুল আমিন, জাতীয় শ্রমিক জোটের যুগ্ম সম্পাদক সালেহ আহমেদসহ গবেষক, প্রাবন্ধিক, ট্রেড ইউনিয়ন নেতৃবৃন্দ, নাগরিক সমাজ ও উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধিরাও আলোচনা সভায় অংশ নিয়ে বক্তব্য রাখেন।
আলোচনায় অনতিবিলম্বে রাজনৈতিক অঙ্গীকারকে কার্যকর করা, নাগরিক সমাজের ধারাবাহিক তাগিদ ও আইনি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা—এসবের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়। সভার অংশগ্রহণকারীরা বলছেন, শুধু ইশতেহারে নাম লেখানো নয়, সেটি বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে প্রতিদিনের স্তরে জবাবদিহিতা চাপিয়ে রাখা প্রয়োজন।
