আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগণের মাত্র তিন দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি দ্বিপাক্ষিক শুল্ক চুক্তি সইয়ের কথা থাকায় ব্যবসায়ী ও বিশ্লেষকদের মধ্যে প্রশ্ন ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সূত্র বলছে, চুক্তিটি আগামী সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) ওয়াশিংটন ডিসিতে সই হওয়ার কথা।
সরকার বলছে, চুক্তির খসড়া ও শর্তাবলি গোপন রাখার শর্তে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট (এনডিএ) ইতিমধ্যেই সই করা হয়েছে। এতে কী কী ধারা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, তা ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট মহলের কাছে অজানা থাকায় অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক চুক্তির ফলে রপ্তানি খাতে সুবিধা আসতে পারে; তবে সেই সুবিধার বিনিময়ে কী শর্ত মানতে হবে এবং সেগুলো বাংলাদেশের শিল্প, বাণিজ্য ও অভ্যন্তরীণ বাজারে কী প্রভাব ফেলবে—এ বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা না থাকার ফলে উদ্বেগ বাড়ছে।
বিজিএমইএ’র জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ইনামুল হক খান বলেছেন, চুক্তির খসড়া নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার দরকার। ‘‘কারা লাভবান হবেন এবং কারা ক্ষতির সম্মুখীন হবে—এসব না জেনে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত নয়,’’ তিনি জানান। তিনি আশা করেন, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানিপণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে কমে ১৫ শতাংশে নামতে পারে, তবে নির্বাচনের ঠিক আগে চুক্তি সই করার সিদ্ধান্ত তাকে বিস্মিত করেছে।
রপ্তানিকারকদের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বাজারমুখী ব্যবসায়ীরাও একই ধরনের অনিশ্চয়তা ও প্রশ্ন তুলেছেন। ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলছেন, খসড়া সম্পর্কে কিছুই জানা না থাকায় মন্তব্য করা কঠিন; এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের কাছে ছেড়ে দেওয়াই যুক্তিযুক্ত হতো।
বিশ্লেষকরা মন্তব্য করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এটি শুধু একটি শুল্ক চুক্তি নয়; এর দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক প্রভাবও আছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-র সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, চুক্তি স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় হচ্ছে না এবং খসড়া গোপন রাখায় এর ভালো-মন্দ বিশ্লেষণের সুযোগ নেই। তাঁর মতে, নির্বাচনের পরে হলেও এই চুক্তি হলে রাজনৈতিক দলগুলো বিষয়টি নিয়ে আলোচনার সুযোগ পেত।
সরকারি সূত্র বলছে, যুক্তরাষ্ট্র চুক্তিতে শুল্ক ও অশুল্ক বাধা, ডিজিটাল বাণিজ্য ও প্রযুক্তি, উৎসবিধি (রুলস অব অরিজিন), জাতীয় নিরাপত্তা ও অন্যান্য বাণিজ্যসংক্রান্ত শর্তকেই গুরুত্ব দিচ্ছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র থেকে কৃষিপণ্য, উড়োজাহাজ ও যন্ত্রাংশ, এলএনজি আমদানি করে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর কথাও আলোচনা তালিকায় রয়েছে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রায় ৬০০ কোটি মার্কিন ডলার, বিপরীতে আমদানি প্রায় ২০০ কোটি ডলার। এই ব্যবধান কমাতে যুক্তরাষ্ট্রি পণ্যের জন্য বাংলাদেশি বাজার আরও উন্মুক্ত করার শর্ত থাকতে পারে বলে ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন।
অনেক বিশ্লেষকেরই মতে, একটি অন্তর্বর্তী সরকার ভোটের ঠিক আগে এমন গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি করলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবেই; চুক্তি সইয়ের সময় কিছুটা পিছিয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানানো যেতে পারত। তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নিলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে বিতর্ক আরও জোরালো হবে—এটিই প্রধান উদ্বেগ।
এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আরও কয়েকটি বড় নীতিসিদ্ধ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গত বছরের নভেম্বরে চট্টগ্রামের পতেঙ্গার লালদিয়ায় নতুন টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালের সঙ্গে ৩৩ বছরের চুক্তি করা হয়েছে। বুড়িগঙ্গার তীরে পানগাঁও নৌ টার্মিনাল ২২ বছরের জন্য সুইজারল্যান্ডের মেডলগ এসএ-র সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। এছাড়া পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনাসহ কিছু সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে, যেগুলোর ফল দীর্ঘমেয়াদি ভাবনায় দেশের ওপর পড়বে।
জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান সোমবার বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘‘এটা চলমান প্রক্রিয়া,’’—এই পরিভাষায় চুক্তি সংক্রান্ত প্রশ্নের সংগে সরকারের অবস্থান সংক্ষেপে তুলে ধরা হয়েছে।
সার্বিকভাবে দেখা যাচ্ছে, নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে এমন একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বচ্ছতা, সময়সীমা ও জবাবদিহি নিয়ে বড় প্রশ্ন রেখে যাচ্ছে। ব্যবসায়ী, বিশ্লেষক এবং বিভিন্ন সচেতন মহল চিহ্নিত ঝুঁকি ও চুক্তির শর্তাবলি পাবার পর বিস্তারিতভাবে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা প্রতিক্রিয়া চাইছেন।

