শিল্পকলা পদকপ্রাপ্ত ময়মনসিংহ অঞ্চলের জনপ্রিয় বাউল শিল্পী সুনীল কর্মকার আর নেই। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শুক্রবার ভোর সাড়ে চারটায় তাঁর মৃত্যু হয় বলে ময়মনসিংহ জেলা বাউল সমিতির সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম আসলাম জানিয়েছেন।
দৃষ্টিহীন হলেও সঙ্গীতের অদম্য সাধনা ও অনন্য কণ্ঠের কারণে সুনীল কর্মকার বাউল, মালজোড়া ও মহাজনী গানসহ লোকসংগীতের এক স্বনামধন্য মুখ ছিলেন। সমাজ রূপান্তর সাংস্কৃতিক সংঘের সভাপতি ইমতিয়াজ আহমেদ জানান, তিনি দীর্ঘদিন লোকসংগীতে অবদান রেখে ২০২২ সালে শিল্পকলা পদকে ভূষিত হন।
সুনীল কর্মকারের জন্ম ১৫ জানুয়ারি ১৯৫৯ সালে পূর্ব ময়মনসিংহের (বর্তমান নেত্রকোণা) কেন্দুয়া উপজেলার বারনাল গ্রামে। পিতা দীনেশ কর্মকার ও মাতা কমলা কর্মকার। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি জ্যেষ্ঠ; দ্বিতীয় ভাই দীলিপ কর্মকার একজন স্বর্ণশিল্পী এবং সর্বকনিষ্ঠ শ্রীমল কর্মকার। তাদের বাবা দীনেশ কর্মকার ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে আশ্রয় শিবিরে অসুস্থ হয়ে মারা যান।
শৈশবে টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হয়ে সুনীলের দৃষ্টিহীনতা হয়। তবু গান তিনি কখনো ছাড়েননি। মাত্র সাত বছর বয়স থেকেই গ্রামের গানের আসরে ছুটে যেতেন; পাশের গ্রামে বিখ্যাত গীতিকবি জালাল উদ্দিন খাঁর সংগীতসভায় নিয়মিত অংশগ্রহণ করতেন—ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, সেই থেকেই গান যেন তাঁর রক্তে মিশে গিয়েছিল।
তার শিল্পজীবনের বড় অংশ গঠিত হয় বাউল গায়ক ইসরাইল মিয়ার পাশে শিষ্যত্বে অনুশীলনে। ইসরাইল মিয়া তাকে নিজের মতো করে লালন-পালন করে সংগীত ও দোতারা, দোতারা বাজানোর পাঠ দেন। পাশাপাশি বাদল পণ্ডিতের কাছে হারমোনিয়াম, কাকা গোবিন্দ কর্মকারের কাছে তবলা এবং লখনউ ঘরানার মীর হোসেনের কাছে বেহালা শেখার মাধ্যমে তিনি বহুমাত্রিক বাদ্যদক্ষতা অর্জন করেন। একতারা, দোতারা, স্বরাজ ও হারমোনিয়াম ছাড়াও খমক, খঞ্জনি, ঢোল, ঢোলক ও ঢাক—সবই তাঁর স্পর্শে প্রাণ পেলো।
স্ত্রী আশা রানী কর্মকার জানান, চার দিন আগে নিউমোনিয়ায় ভুগতে শুরু করলে তাঁকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়; চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তিনি বলেন, “উনি যে এভাবে চলে যাবেন, সেটা ভাবতেও পারিনি। তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী তাকে গৌরীপুরের কলতাপাড়া এলাকায় সমাহিত করা হবে।”
ময়মনসিংহ বাউল সমিতির সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম জানান, দীর্ঘদিন থেকেই তিনি অসুস্থ ছিলেন। নেত্রকোণার বাউল শিল্পী রাসেল সরকার জানান, শ্রদ্ধা জানাতে দুপুরে মরদেহ ময়মনসিংহ কোতোয়ালি থানার পাশে হযরত কালু শাহ ফকিরের মাজারের সামনে রাখা হয়।
নেত্রকোণা সাহিত্য সমাজের সভাপতি মাহাবুবুল কিবরিয়া চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক তানভীর চৌধুরী সহ সাংস্কৃতিক মহল সুনীল কর্মকারের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন এবং তাঁর পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন।
সুনীল কর্মকারের প্রয়াণে লোকসংগীত ও বাউল সম্প্রদায়ের অপূরণীয় এক শূন্যতা সৃষ্টি হলো—এক জন শিল্পী যার গান ও সঙ্গীত জীবন বহু প্রজন্মের স্মৃতিতে চিহ্ন হয়ে থাকবে।

