পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নতুন কোনও কমিশন গঠন করা হবে না, বরং ইতোমধ্যেই গঠিত স্বাধীন জাতীয় তদন্ত কমিশনের সুপারিশগুলো পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ। তিনি বুধবার জাতীয় শহীদ সেনা দিবসে বনানী সামরিক কবরস্থানে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে এ ঘোষণা দেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, নতুন করে কোনও তদন্ত কমিশন গঠন করা হবে না। তিনি বলেন, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় একটি স্বাধীন জাতীয় কমিশন গঠিত হয়েছিল, যার প্রতিবেদনও এসেছে। আমাদের অতীত থেকে শেখার রয়েছে। এই রিপোর্টের ভিত্তিতে আমরা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেব।’ তিনি আরও কিছু সুপারিশের বাস্তবায়ন চলমান থাকায় গুরুত্ব দেন।
আগের বক্তব্যে এটি স্পষ্ট ছিল যে, নতুন কোনও তদন্তের প্রয়োজন নেই। এর আগে ২৩ ফেব্রুয়ারি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন বলেছিলেন যে, পিলখানার বিডিআর বিদ্রোহের পুনঃতদন্তের জন্য নতুন একটি কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে বুধবার তিনি এই বক্তব্য সংশোধন করে বলেন, ‘আমি কিছুদিন আগে প্রতিবেদন পুরো না দেখেই কিছু কথা বলেছি, সেটা আমি ক্ষমা চাচ্ছি। আমাদের দায়িত্ব হলো সুপারিশের বাস্তবায়ন করা।’
তিনি জানিয়ে দেন, পুনঃতদন্তের জন্য আর কোনও নতুন কমিশন গঠন করা হবে না। পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পরের বিচারিক কার্যক্রমও সময়মত পরিচালিত হবে। এছাড়া, এর সাথে যুক্ত বিচারপ্রক্রিয়া ও অন্যান্য সুপারিশগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে বলে নিশ্চিত করেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এই ঘটনার পেছনে কারণ অনুসন্ধানে তৎকালীন সরকারের গঠিত কমিটির রিপোর্ট এখন পর্যন্ত প্রকাশিত হয়নি। তিনি আশ্বাস দেন, ‘ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবো। এই ধরনের ঘটনা যাতে আর পুনরাবৃত্তি না হয়, তার জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেব।’
তিনি আরও বলেন, ‘পিলখানা হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি ছিল। বহু প্রচেষ্টা ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে দেশের সেনাবাহিনীকে দুর্বল করে তার শক্তি কমানোর লক্ষ্য ছিল। এসব চক্রান্ত তারা জোরালোভাবে চেষ্টা করেছে যারা দেশের স্বাধিকার এবং শক্তি বিশ্বাস করে না।’
২০০৯ সালে ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার পিলখানায় সীমান্তরক্ষা বাহিনীর সদরদপ্তরে বিদ্রোহের ঘটনায় ৫৭ জন সেনাকর্তা সহ ৭৪ জন নিহত হন, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। ঘটনার পর বাহিনী বদলে যায়, এখন তারা বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) হিসেবে পরিচিত।
দীর্ঘ দিন সময় পর, ২০১৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরে, অন্তর্বর্তী সরকার এই ঘটনায় পুনঃতদন্তের দাবি ওঠে। অবশেষে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে নতুন তদন্ত কমিশন গঠন হয়, যা গত বছর প্রতিবেদন জমা দেয়। ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, প্রধান সামরিক নেতাদের বিশ্লেষণে এই হত্যাকাণ্ড পরিকল্পিত, এবং এর পেছনে থাকা বিভিন্ন সূত্র ও ভারতীয় যোগসাজশের তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদনে বিশেষ করে সাবেক সংসদ সদস্য শেখ ফজলে নূর তাপসের সংশ্লিষ্টতার কথাও বলা হয়, যার মাধ্যমে এই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা ছিল বলে প্রকাশ হয়। কমিশনের প্রধান অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আ ল ম ফজলুর রহমান আরও জানিয়েছেন, এই ঘটনার দায়ভার বর্তায় তৎকালীন সরকারের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে শুরু করে সেনাপ্রধান পর্যন্ত। তিনি বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানিক সমাধানের জন্যই এই অবস্থানে পৌঁছানো হয়েছিল। পুলিশ, র্যাব এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোরও ভিন্ন কথা নয়।’
কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ভবিষ্যতে ধরনের ঘটনাগুলো এড়ানো ও শিকার ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার নিশ্চিতের জন্য বেশ কিছু সুপারিশ প্রণয়ন করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সবশেষে আশ্বস্ত করেন, ন্যায়বিচার হবে এবং দেশের নিরাপত্তা শক্তিশালী করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

