ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের জ্বালানি বাজারে। এই সংকটের কারণে দেশের বিভিন্ন অংশে তেলের সরবরাহ অনেকটাই বন্ধ হয়ে গেছে বা কমে গেছে। পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বেশ কয়েকটি ফিলিং স্টেশন সম্পূর্ণরূপে তেলশূন্য করে ফেলেছে, বিশেষ করে ঢাকাসহ গাজীপুরের বেশির ভাগ পাম্প এখন তেলবিহীন।
রবিবার (৮ মার্চ) ভোর থেকেই রাজধানী থেকে শুরু করে জেলা শহরেও ‘পেট্রোল নেই’, ‘অকটেন নেই’ লেখা পোস্টার ও ব্যানার দেখা যাচ্ছে, যা সাধারণ চালকদের মধ্যে দুশ্চিন্তা ও হতাশার জন্ম দিয়েছে। বহু মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়ি এবং গণপরিবহনের চালকরা চরম বিপাকের মধ্যে পড়েছেন। অনেকেই তখনই তেলের সন্ধানে এক থেকে অন্য পাম্পে ঘুরে যাচ্ছেন, কিন্তু ফল শূন্য। পরিস্থিতি খারাপ হওয়ায় কিছু কিছু পাম্পে সিএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও যানবাহনের উপচেপড়া ভিড় দেখা গেছে।
গাজীপুর ও ঢাকাস্থ বিভিন্ন স্পট ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ ফিলিং স্টেশন অনেকটাই জনশূন্য। বিক্রয়কারী কর্মীদের বদলে সেখানে নিরাপত্তাকর্মীরা বসে থাকছেন। বেশ কিছু পাম্পের প্রবেশপথে দড়ি বা ব্যারিকেড দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যা নিরাপত্তার জন্য। তবে কিছু পাম্পে এখনও সিএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও সেখানে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন লেগে আছে। বিশেষ করে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে কিছু মিনিবাস দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্য দেখা গেছে, যারা ক্ষোভে ফুঁসছেন।
খাঁপাড়া রোড সংলগ্ন এশিয়া ফিলিং স্টেশনে বাইকে দাঁড়িয়ে থাকা চাকরিজীবী কামরুল হাসান জানান, তিনি আজ সকাল থেকে চারটি পাম্প ঘুরে এর মধ্যে কোথাও এক লিটার তেলও পাননি। অফিসে কীভাবে যাবেন বুঝতে পারছেন না। এই অবস্থা চলতে থাকলে সামনে আরও কী হবে, তা ভাবতেই ভয় হচ্ছে।
আরিফ আহমেদ নামে একজন যানবাহন চালক বলেন, এই পরিস্থিতিতে গাড়িতে তেল নেওয়া hampir অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, যে গ্যারেজে যাবেন, সেখানেও তেল নেই। তাঁরা এখন রাস্তায় গাড়ি রেখে অপেক্ষা করছেন, কারণ তেল না থাকায় গাড়ি চালানো সম্ভব নয়।
অপর এক নিরাপত্তাকর্মী বলেন, গত কয়েক দিন আগে থেকেই মানুষের ভিড় খুব বেশি হয়ে যায়, সবাই ড্রামে তেল নিতে চাচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত স্টক শেষ হয়ে গেছে, এখন আমাদের কাজ শেষ, সবাইকে ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে।
বдин্ডু ক্ষতি ও সংকট বাড়লেও রাজধানীর বিমানবন্দর এবং এর আশপাশের কিছু এলাকায় এক ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। এই এলাকায় থাকা দুইটি ফিলিং স্টেশনে কিছু সাময়িক তেলের মজুদ থাকায় সেখানে চালকদের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে। চাহিদার তুলনায় জোগান কম থাকায় সরকার নির্ধারিত রেশনিং বা সীমিত পরিমাণে তেল বিক্রি করছে।
সড়ক পথে তৈরি হয়েছে দীর্ঘ জটলা। বিমানবন্দরে আসা এত শত চালক অপেক্ষা করছেন, কেউ কেউ অনশনীয় চোখে অপেক্ষারত। নিরাপত্তাকর্মীরা শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন।
সোহরাব হোসেন নামে এক চালক বলেন, শহরের কোথাও তেল পাওয়া যায়নি। এখানে এসে শুনলাম তেল আছে, কিন্তু দুই ঘণ্টা ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। কখন গাড়ি পাম্পের মুখে যাবে, জানি না।
এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সাময়িক এই জ্বালানি সংকটের সমাধানে সরকার আজ রোববার থেকে নতুন করে তেল রেশনিং ব্যবস্থা চালু করার ঘোষণা দিয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) নির্ধারিত যানবাহনের ধরন অনুযায়ী তেলের পরিমাণ নির্ধারণ করেছে। এই নতুন নিয়ম অনুযায়ী, একজন মোটরসাইকেল চালক দিনে সর্বোচ্চ ২ লিটার পেট্রোল বা অকটেন তুলতে পারবেন। ব্যক্তিগত গাড়ি (কার) জন্য নির্ধারিত পরিমাণ ১০ লিটার। এছাড়া এসইউভি বা জিপ এবং মাইক্রোবাসের জন্য প্রতিদিন ২০-২৫ লিটার তেল বরাদ্দ।
পথচলা চলাচলের জন্য ডিজেল সরবরাহও কঠোর রেশনিং এর আওতায় আনা হয়েছে। সাধারণ রুটের বাস ও পিকআপ ভ্যানরা বর্তমানে দিনে ৭০-৮০ লিটার ডিজেল নিতে পারবেন, আর দীর্ঘ পথের যানবাহন যেমন বাস, ট্রাক বা কনটেইনার লরি প্রতি দিন ২০০-২২০ লিটার ডিজেল পাবে। সরকার জানিয়েছে, যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে নানা অনিশ্চয়তা দেখা দেওয়ায় এই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
