সরকারের গত ১৮০ দিনে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করে দেশের রপ্তানি খাতের উন্নয়ন, বৈচিত্র্য ও আধুনিকায়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করেছে। এর মাধ্যমে দেশের ব্যবসা পরিবেশ সহজলভ্য করে তুলতে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করতে সচেষ্ট হয়েছে সরকার। মূল পরিকল্পনাগুলোর মধ্যে রয়েছে রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, নতুন বাজারে প্রবেশ, অর্থনৈতিক কূটনীতি জোরদার এবং ব্যবসায় আরো স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি।
বাংলাদেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণে বেশ কিছু অগ্রগতি দেখা গেছে। দীর্ঘদিন ধরে যেহেতু দেশের রপ্তানি মূলত তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভরশীল, তবে এবার নানা সম্ভাবনাময় খাতে দৃষ্টি দেওয়া হচ্ছে। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল, ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষিপণ্য ও পাটজাত পণ্যসহ নানা খাতে গুরুত্ব বেড়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ বিশ্বের ২০২টি গন্তব্যে ৮১২টি পণ্য রপ্তানি করছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৪৩টি পণ্য ও সেবা খাতে বিভিন্ন সহায়তা ও প্রণোদনা দিচ্ছে সরকার, যার মধ্যে রয়েছে নগদ সহায়তা, বিশেষ কৌশলগত উদ্যোগ ও ব্র্যান্ডিং প্রচেষ্টা।
এছাড়াও, ২০২৬ সালের জন্য ‘পেপার অ্যান্ড প্যাকেজিং’ শিল্পকে বর্ষপণ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে আন্তর্জাতিক বাজারে এই খাতে বাংলাদেশের উপস্থিতি আরও শক্তিশালী করা সম্ভব হয়। ‘এক গ্রাম এক পণ্য’ (OVOP) উদ্যোগের আওতায় দেশের ১৪টি বিশেষ পণ্য ও ৬২টি জিআই পণ্যের বাইরেও আন্তর্জাতিক বাজারে সম্ভাবনা যাচাই চলছে।
অর্থনৈতিক কূটনীতিতে জোর দেওয়ার মাধ্যমে এলডিসি উত্তরণের পরে সুবিধাগুলি ধরে রাখতে এবং নতুন বাণিজ্য অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে কাজ চলছে। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া যেমন গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিতে অগ্রসর হয়েছে, তেমনি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ইউরোপ ও অঞ্চলের অন্যান্য সহযোগিতামূলক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো মার্কেট অ্যাক্সেস উন্নত করা, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং প্রযুক্তি স্থানান্তর নিশ্চিত করা।
বাজারে বাংলাদেশের উপস্থিতি আরও বিস্তৃত করতে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) বিশ্বব্যাপী প্রায় ৫০টি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। এসব মেলায় তৈরি পোশাকের পাশাপাশি চামড়া, কৃষিপণ্য, হস্তশিল্প, আইটি, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ও পাটজাত পণ্য প্রভৃতি নতুন সম্ভাবনাময় খাতে উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা অংশগ্রহণ করবেন। এর মূল লক্ষ্য হলো, সরাসরি ক্রেতাদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন, নতুন রপ্তানি আদেশ সংগ্রহ ও বাংলাদেশের ব্র্যান্ড ইমেজ উন্নয়ন।
এদিকে, দেশের অর্থনীতি আরও সুদৃঢ় করতে ও এলডিসি থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ‘আমদানি নীতি ২০২৬-২০২৯’ প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই নীতিতে ব্যবসা সহজ, শিল্পের সুরক্ষা ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। অপ্রয়োজনীয় ও বিলাসবহুল আমদানিগুলো কমানোর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও আধুনিক প্রযুক্তির আমদানি প্রক্রিয়াও আরও সুবিন্যস্ত ও দ্রুত করতে পরিকল্পনা রয়েছে।
টিসিবি (ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ) এছাড়া আধুনিক ও স্বচ্ছ করতে নানা সংস্কার ও ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে রূপান্তর করছে। স্লোগান ‘কোটি মানুষের পাশে’ ধারণ করে চাহিদামাফিক নিত্যপণ্য সরবরাহ ও বাজার স্থিতিশীলতা নিশ্চিতের লক্ষ্যে, স্মার্ট কার্ড ও বায়োমেট্রিক তথ্যের মাধ্যমে কার্যক্রম চালু করা হচ্ছে। এতে ভর্তুকির দুর্নীতি কমানো ও লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দেওয়া সম্ভব হবে।
বাণিজ্য পরিচালনা ও ব্যবসার সহজীকরণের জন্য বিভিন্ন প্রশাসনিক সংস্কারও বাস্তবায়িত হচ্ছে। যেমন, রপ্তানি নিবন্ধনের মেয়াদ বাড়ানো, অনলাইন সার্টিফিকেট চালু ও কোম্পানি সংশোধন প্রক্রিয়া সহজীকরণ। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে ব্যবসার উপর চাপ কমবে, এবং রপ্তানিকারকদের জন্য সুবিধা বাড়বে বলে প্রত্যাশা।
বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত ও ভোক্তা সুরক্ষায়ও বেশকিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন ‘অত্যাবश्यक পণ্য আইন, ২০২৬’ প্রণয়নসহ, মূল্য নিয়ন্ত্রণ ও ভেজাল প্রতিরোধের জন্য পরিকল্পনা চালু রয়েছে। প্রতিযোগিতা কমিশনও কার্যক্রম জোরদার করে বাজার মনিটরিং করছে।
নারী ও যুব উদ্যোক্তা উন্নয়নে বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে। নারীর অংশগ্রহণে বিভিন্ন উদ্যোগের পাশাপাশি, প্রশিক্ষণ ও মিলিয়ে নতুন উদ্যোক্তা তৈরির জন্য কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। এছাড়া, ডে-কেয়ার ও ব্রেস্টফিডিং কোর্নার স্থাপনসহ নারীদের জন্য সুবিধা বৃদ্ধি করা হয়েছে।
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের নতুন চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশের ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটের (বিএফটিআই) মাধ্যমে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ ও কোর্স চালু করা হয়েছে। এই সব পরিকল্পনা ও উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো বাংলাদেশের বাণিজ্য খাতকে আরও প্রতিযোগিতামূলক, টেকসই ও গতিশীল করে তোলা।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, এসব উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের রপ্তানি বহুমুখী হবে, বিনিয়োগ বাড়বে ও প্রযুক্তি স্থানান্তর সহজ হবে। দীর্ঘমেয়াদে এটা দেশের অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও একটি শক্তিশালী, বহুমুখী রপ্তানিমুখী অর্থনীতি গড়ে তুলবে বলে মনে করা হয়।
