রাজধানীর শাহবাগ এলাকায় তৃতীয় লিঙ্গের একদল ট্রান্সজেন্ডার ও সমকামীদের ওপর সংঘবদ্ধভাবে হামলার ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার (১০ এপ্রিল) সন্ধ্যা সাড়ে ৮টার দিকে ৩০ মিনিটে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের সামনে এ ঘটনা ঘটে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গতকাল রাজধানীর শাহবাগে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের সামনে প্রতিদিনের মতোই আড্ডা দিচ্ছিলেন ট্রান্সজেন্ডার ও সমকামী ব্যক্তিরা। তাঁরা তাদের কমিউনিটি ও বন্ধুদের সাথে সমবেত হয়ে নিজেদের মধ্যেই গল্পগুজব করছিলেন।
একই দিনে সন্ধ্যার পরপরই শাহবাগ এলাকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর খেলাফত ছাত্র মজলিসের কোষাধ্যক্ষ আলী হোসেন তন্ময় -এর নেতৃত্বে সংগঠিত ‘আজাদী আন্দোলন’ নামক ব্যানারে খেলাফত ছাত্র মজলিস এর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার কমপক্ষে ৭০-৮০ জন কর্মী জড়ো হতে থাকেন। তাঁরা সেখানে বাংলাদেশ তথা শাহবাগকে তথাকথিত “সমকামী কর্মসূচি” মুক্ত করার দাবি জানিয়ে সমাবেশ করেন। উক্ত সমাবেশ শুরু হওয়ার পর তাদের সাথে যুক্ত হন আরও বেশ কিছু স্থানীয় জনতা এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই সেখানে উত্তেজনা দেখা দেয়।
উক্ত সমাবেশে ‘আজাদী আন্দোলন’ এর ব্যানারে সমকামীদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের স্লোগান দিতে শোনা যায়। তাঁরা এক পর্যায়ে স্লোগান দিতে দিতে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের সামনে এগিয়ে আসেন।
‘আজাদী আন্দোলন’ এর নেতারা স্লোগান দিতে দিতে বলেন এই এলাকায় সমকামীদের জন্য কোন স্থান নেই এবং তাদেরকে ১০ মিনিটের আল্টিমেটাম দিয়ে শাহবাগ এলাকা ত্যাগ করার জন্য হুমকি প্রদান করে বলেন “যদি তোমরা চত্বর মুক্ত না করো হাত পা নিয়ে বাসায় যেতে দিবো না ইনশাল্লাহ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শেখ হাসিনাকে সময় বেধে দিয়েছিল ৪৫ মিনিট, তোমাদের দিলাম ১০ মিনিট, তোমরা যদি ১০ মিনিটের মধ্যে চত্বর ছেড়ে না যাও রক্তের বন্যা বয়ে যাবে, হাত পা নিয়ে পালিয়ে যেতে পারবেনা ইনশাল্লাহ।” এবং এক পর্যায়ে ‘আজাদী আন্দোলন’ এর তৌহিদী জনতার সদস্যরা সেখানে অবস্থানরত উক্ত ট্রান্সজেন্ডার ও সমকামী ব্যক্তিদের ওপর অতর্কিতে হামলা চালান।
উক্ত হামলায় বেশ কয়েকজন সমকামী ও তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তি আহত হয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ‘আজাদী আন্দোলন’ এর সদস্য ও উত্তেজিত জনতা মাইকে ‘ধর ধর, সমকামী ধর’ বলে সমকামী ও তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিদের বেধড়ক মারধর করে এবং তাদের ধাওয়া করে শাহবাগ এলাকা থেকে তাড়িয়ে দেয়। নিচে এই ঘটনাটির ভিডিও ফুটেজ দেওয়া হলঃ
সমকামী ও ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিদের মারধর করে এলাকা ছাড়া করার পর খেলাফত ছাত্র মজলিসের নেতাকর্মীরা ‘আজাদী আন্দোলন’ এর ব্যানারে রাত প্রায় সাড়ে ১১টা পর্যন্ত পুরো শাহবাগ এলাকা জুড়ে সমকামীদের বিরুদ্ধে মিছিল করেন। উক্ত মিছিলে তাদের, “লেসবিয়ানের নোংরা হাত, ভেঙ্গে দাও গুড়িয়ে দাও”, “সমকামীদের নোংরা হাত, ভেঙ্গে দাও গুড়িয়ে দাও”, “ট্রান্সজেন্ডারদের নোংরা হাত, ভেঙ্গে দাও গুড়িয়ে দাও”, “সমকামীদের চামড়া তুলে নেব আমরা ”, “সমকামীদের ঠিকানা শাহবাগে হবেনা”, “এই বাংলা আমরা ট্রান্সজেন্ডারদের মেনে নিতে পারিনা”, “রাজপথ চত্বর, আজাদি আসছে” ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের সমকামী বিরুদ্ধ স্লোগান দিতে শোনা যায়।
উক্ত মিছিলে খেলাফত ছাত্র মজলিসের নেতাকর্মীরা ছাড়াও যুক্ত হয়েছিলেন কয়েকশ স্থানীয় জনতা। এক পর্যায়ে নেতাদের একজন মাইকে বলে উঠেন, “সমকামীদেরকে কি আমরা বাংলায় জায়গা দিতে পারি? ওরা কি মানুষ?” এবং উপস্থিত সকলে সমস্বরে বলে উঠেন, “না”।
এ বিষয়ে আমাদের প্রতিবেদক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর খেলাফত ছাত্র মজলিসের কোষাধ্যক্ষ আলী হোসেন তন্ময়-এর সাথে কথা বললে তিনি জানান, “বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বেশ কিছুদিন ধরেই গভীর এক আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র চলছে। মূলত পশ্চিমা দেশগুলো আমাদের মুসলমান সমাজ ও মুসলমানদের একতাকে বিনষ্ট করে দেওয়ার জন্য সমকামিতার মতো ঘৃণিত বিষয়গুলো খুব সুকৌশলে আমাদের সমাজে ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে। এই সমকামীরা আমাদের সমাজের জন্য বিষফোড়া। আমাদের মুসলমানদের ইসলাম ধর্ম বলেন আর বাংলাদেশের আইন বলেন, সমকামীদের জন্য কোনভাবেই আমাদের দেশে জায়গা নাই। কিন্তু তারপরেও আমাদের সমাজকে নষ্ট করার জনই ইচ্ছে করে পশ্চিমা দেশগুলো ষড়যন্ত্র করে এই সমকামীদের আমাদের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে তরুণ সমাজকে নষ্ট করার পায়তারা করছে। এবং তাদের সাথে যুক্ত হয়েছে আমাদের তথাকথিত কিছু বাংলাদেশি ব্লগার। দীর্ঘদিন ধরে সুব্রত শুভ, খায়রুল্লা খন্দকার, এমডি আরিফুল ইসলাম, শুভজিত ভৌমিক, নাদিয়া ইসলাম, এমডি রাসেল রাব্বি, ফড়িং ক্যামেলিয়া, নাফিউর রেজওয়ান, জয় বিশ্বাস, আসিফ মহিউদ্দিন, রাকিন আহমেদ সহ বেশ কিছু ব্লগার দেশ ও দেশের বাইরে থেকে ক্রমাগত অনলাইনে সমকামিতার পক্ষে লেখালেখি করে বাংলাদেশে সমকামিতাকে নরমালাইজ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এরা মূলত পশ্চিমাদের দালাল, তারা বাংলাদেশের মুসলমান সমাজ ব্যবস্থাকে বিনষ্ট করার জন্যই দীর্ঘদিন ধরে এই চক্রান্ত করে আসছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে আমাদের এই দেশ ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশ। এই দেশে সমকামীদের জন্য কোন জায়গা কোন দিন ছিল না, কখনওই হবেও না। আজকে তো তাদের অল্প করে আল্টিমেটাম দিয়ে ছেড়ে দিয়েছি, সামনে তাদের পরিণতি ভয়াবহ হবে।”
উক্ত হামলার শিকার ভুক্তভোগী ব্যক্তিরা জানিয়েছেন তারা প্রায় ৮-১০ জন বন্ধু ছুটির দিন হওয়ায় প্রতিদিনকার মতো উক্ত এলাকায় সমবেত হয়ে আড্ডা দিচ্ছিলেন এবং স্থানীয় একটি চাএর দোকানে চা খাচ্ছিলেন। তাদের সাথে একজন হিজড়া এবং একজন ট্রান্সজেন্ডার বন্ধু ছিলেন। এটি তাদের নিতান্তই বন্ধুদের আড্ডা ছিল এবং তাঁরা কোন ধরনের কারণ বা উস্কানি ছাড়াই ‘আজাদী আন্দোলন’ এর তৌহিদি জনতার আক্রমণের শিকার হয়েছেন।
তারা আরও অভিযোগ জানিয়েছেন যে তাদের সাথে থাকা বেশ কিছু নারী সদস্য উক্ত আক্রমণের সময় যৌন হেনস্তারও শিকার হয়েছেন। মেয়েদের চুল টেনে মাটিতে ফেলে লাথি মারা হয়। ইট বোঝাই ব্যাগ দিয়ে আঘাত করা হয় এবং নারী পুরুষ নির্বিশেষে সবাইকে আক্রমণ এবং শ্লীলতাহানী করা হয়, বিশেষ করে মাথা, বুক, পিঠ এবং যৌনাঙ্গ লক্ষ্য করে আঘাত করা হয়। মেয়েদের জামাকাপড় খুলে ফেলার চেষ্টা করা হয় এবং কয়েকজনের কাপড় ছিঁড়ে ফেলা হয়। তাঁরা আরও জানান, উক্ত আক্রমণের ঘটনার সময় শাহবাগ থানার সামনে পুলিশ উপস্থিত ছিল। ঘটনাটি তাদের সামনে ঘটলেও একজন পুলিশ সদস্যের কাছে গিয়ে সাহায্য চাইলে তিনি নির্লিপ্তভাবে দাঁড়িয়ে থাকেন। এমনকি ঘটনার পরবর্তীতে থানায় মামলা করার অনুরোধ করলেও পুলিশের ব্যবহার ছিল খুবই দায়সারা গোছের এবং পুলিশ মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানায় এবং উল্টো বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি প্রদর্শন করে।
এদিকে শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান এর সাথে এই বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি জানান, “বর্তমানে এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘটনাটি নজরদারিতে রেখেছে। এই বিষয়ে অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে এখনও কোন মামলা দায়ের করা হয়নি”।
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, শাহবাগ এলাকায় ট্রান্সজেন্ডার ও সমকামী ব্যক্তিদের প্রতিদিনের উপস্থিতি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ ছিল। স্থানীয়দের দাবি সমকামী ও তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিরা সেখানে প্রতিদিন আড্ডা দেন এবং তাদের বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি ও চলাফেরা স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাঁরা আরও বলেন সমকামিরা নিকৃষ্ট, সমকামিতার মত বিষয় সমাজ ও ধর্মীয় দুই দৃষ্টিকোণ থেকেই ঘৃণিত এবং তাদের কারণে স্থানীয়দের পরিবার নিয়ে চলাফেরা করতে কষ্ট হচ্ছিল।
অন্যদিকে, কমিউনিটির সদস্যরা বলছেন, তারা শুধু আড্ডা দিতে এসেছিলেন এবং হামলাটি অযৌক্তিক ও সহিংস।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনাটির ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে তা ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়। কেউ কেউ জনতার হামলাকে “স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ” বলে অভিহিত করলেও, মানবাধিকার কর্মীরা এ ধরনের সহিংসতার নিন্দা জানিয়েছেন। তারা বলছেন, যেকোনো ব্যক্তির প্রতি সহিংসতা গ্রহণযোগ্য নয় এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া উচিত নয়।
বাংলাদেশে এলজিবিটিকিউ+ সম্প্রদায়ের সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক ও ধর্মীয় রক্ষণশীলতার কারণে চাপের মুখে রয়েছেন। সমকামিতা যেমন ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নিষিদ্ধ, আবার বাংলাদেশের আইন অনুযায়ীও এটি একটি শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ। আবার ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সমাজে রক্ষণশীল গোষ্ঠীর প্রভাব বেড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর আগেও গত বছর এবং এই বছর মিলিয়ে কক্সবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে ট্রান্সজেন্ডার ও সমকামীদের ওপর বেশ কয়েকটি হামলা ও গ্রেফতারের ঘটনা ঘটেছে।

