দেশের সাতটি প্রধান জেলায় প্রবল বন্যা ও পাহাড়ধসের কারণে জীবন আরো রঙীন হয়ে উঠেছে। অবিরাম বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের ফলס্বরূপ অনেক এলাকা এখন পানির নীচে তলিয়ে গেছে। পাহাড়ধসের ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতি বেড়ে চলেছে, আর মৃত্যুর সংখ্যাও এখন ৫১ এ পৌঁছেছে। এই দুর্যোগের প্রভাব পড়েছে লাখো মানুষোঁ জীবনযাত্রার ওপর। ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ১০ লাখ মানুষ, যারা মানবিক সংকটে দিন কাটাচ্ছেন, খাবার-দাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকটের ভেতরে আসুতি।
চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি—এই পাঁচ জেলায় বন্যার প্রকোপ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। আরও কিছু অঞ্চলেও পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে, যেমন সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্যে জানানো হয়েছে, ১২ জুলাই দুপুরের পর থেকে এ সব জেলাতেও ব্যাপক বন্যা চলছে। এখন পর্যন্ত এ জেলাগুলিতে ২ লাখ ৬৭ হাজার এবং ১০ লাখেরও বেশি মানুষ পানিবন্দী হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা আরও বাড়ছে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে এই দুর্যোগে মৃতের সংখ্যা এখন ৫১; এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মারা গেছেন কক্সবাজারে—২৮ জন। এর বাইরে চট্টগ্রামে ১৩, বান্দরবানে ৬, রাঙামাটিতে ৩ ও মৌলভীবাজারে ১ জনের মৃত্যু হয়েছে। ৫ জুলাই থেকে শুরু হওয়া ভারী বর্ষণের ফলে চট্টগ্রাম অঞ্চলে এখনো অব্যাহত ভারী বর্ষণ চলছে। আকাশে অন্ধকার ভেঙে পড়েছে, ফসিলের হিসাব মতে, গত ২৪ ঘণ্টায় ১৫১.৭ মিলিমিটার পর্যন্ত জলবৃষ্টির রেকর্ড রয়েছে। আবহাওয়া বিভাগ জানাচ্ছে, সামনের দুই-তিন দিনেও এই ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকবে, পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
অন্যদিকে সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জেও বন্যার পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের প্রকৌশলী পার্থ প্রতীম বড়ুয়া বলেছেন, সম্ভবত এক দিনের মধ্যে চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিস্থিতি সংস্কার হতে পারে। তবে সিলেটের নিম্নাঞ্চলের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে, যত বেশি বৃষ্টিপাত হবে, ততই বন্যার অবনতি হতে পারে।
পানির পাহাড়-পথে ভেঙে পড়ে সড়ক-সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এবং নিচে জল নামতে থাকলেও অনেক জায়গায় নতুন করে বন্যার অমোত সৃষ্টি হয়েছে। শহরগুলোতে পানি জমে থাকায় মানুষ বাঁশের নৌকায় চলাচল করছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী, অনেক এলাকা থেকে মানুষ এখনো ত্রাণের অভাবে বিপদে রয়েছেন। দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ জনপদ, বাঁশখালী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও চন্দনাইশের অনেক গ্রামে হাঁটু বা কোমরপ্রবাহিত পানিতে মানুষ দিন কাটাচ্ছে। বিশুদ্ধ পানির মতো মৌলিক চাহিদাও সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত। চলন্ত পানির মধ্যে রয়েছে নানা ধরনের খাদ্যশস্য ও গবাদিপশু, যা আবার নতুন উদ্বেগের কারণ।
চট্টগ্রাম জেলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত, যেখানে ঘর-সংসার, চাল-আটা-রান্নার উপকরণসহ অন্যান্য সব কিছুই নদীর পানিতে ডুবে গেছে। অনেক এলাকা থেকে এখনও পানি সরেনি, অস্থায়ী বাড়িঘর ধসে পড়ছে। বিশেষ করে, পানির সংকটের কারণে বিশুদ্ধ পানির সরবরাহের ব্যাপক সংকট দেখা দিয়েছে।
কক্সবাজারে যদিও কিছু এলাকা থেকে পানির আধিক্য কমে আসছে, তবুও দুঃখ-দুর্দশার শেষ নেই। চকরিয়া, পেকুয়া, রামু ও সদরের প্রায় সব অংশে পানি প্রবাহ অব্যাহত। কোথাও কোথাও বাঁধ ভেঙে জনজীবন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মানুষ এখন নৌকায় চলাচল করছে।
উপতর জেলা পার্বত্য এলাকার পরিস্থিতি যদিও তুলনামূলক কিছুটা উন্নতির দিকে। পানি ধীরে ধীরে নামতে শুরু করেছে। এখনো অনেক সড়ক ও সেতু পানির নিচে রয়েছে, তবে কিছু এলাকা থেকে মানুষ বাড়ি ফিরতে শুরু করেছেন। বান্দরবানের পরিস্থিতি সবচেয়ে নাজুক, যেখানে বেশির ভাগ এলাকা পানিাবদ্ধ। শনিবার বিকেল থেকে বৃষ্টি কমে গেছে, ফলে সাঙ্গু নদীর পানি কিছুটা কমছে। রাঙামাটি, বান্দরবান ও খগড়াছড়িও অল্প কিছু এলাকা থেকে পানি কমতে শুরু করেছে। তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।
হবিগঞ্জে বন্যার প্রভাব এখনও দৃশ্যমান। সেখানে অন্তত ৬ হাজার পরিবার পানিবন্দী। নিম্নাঞ্চলের জলাবদ্ধতা বেশি থাকায় জীবনযাত্রা ব্যাহত। মৌলভীবাজারের পাঁচটি জেলায় বন্যা পরিস্থিতি অব্যাহত, হাজারো পরিবার পানিবন্দী। সুনামগঞ্জে কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে নদ-নদীর পানি বেড়ে গেছে; বন্যার আশঙ্কা করছে কর্তৃপক্ষ। নেত্রকোনায় বিভিন্ন নদীর পানি বাড়ছে, কিছু এলাকায় স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
কুড়িগ্রামের বিভিন্ন নদীতে ভাঙন বেড়েছে, জীবিকা আয় ও বাড়িঘর হারানোর শঙ্কায় নদীতীরবর্তী মানুষ। যশোরের কেশবপুরেও কিছু ভবন পানিতে খোয়ানো হচ্ছে। সমগ্র দেশে বিশাল এই দুর্যোগের মাঝেও, সরকার ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলো পরিস্থিতি মোকাবেলায় কাজ করছে। তবে দেথে যাচ্ছে, পরিস্থিতি আরো জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

