বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান হত্যার তদন্তে নতুন ও চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসছে। সম্প্রতি নিজেকে পলাতক থাকা সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেনকে গ্রেপ্তার করে সেনাবাহিনীর হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। প্রত্যক্ষসূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে তাকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে, যেখানে তিনি এই হত্যাকাণ্ডের অজানা কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মোজাফফর বর্তমানে স্বচক্ষে হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য সব বিস্তারিত বিবরণ প্রদান করছেন। তিনি জানান, প্রথম গুলি কে ছুড়েছিল, লাশ প্রথম কারা সরিয়েছিল, মরদেহ কোথায় কোথায় নেওয়া হয়েছিল এবং হত্যাকাণ্ডের পর পালিয়ে যাওয়ার সময় কারা তার সাহায্য করেছিল—এসব বিস্তারিত তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন। তবে বেশ কিছু বিষয়ে তিনি নিজেকে আড়াল রাখতে চেয়েছেন ও বেশ কিছু সময় হাইড আউটও করেছেন। আজ পর্যন্ত অনেক কিছু তিনি স্বীকার করেছেন, যা এই হত্যাকাণ্ডের পেছনের সত্য উদ্ঘাটনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রতিষ্ঠানিক সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, মোজাফফরের কাছ থেকে পাওয়া এই তথ্যগুলো অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং এই মুহূর্তে এগুলো মিডিয়ায় প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে না। তার নিরাপত্তার জন্য তাকে এক বিশেষ ইউনিটে স্থানান্তর করা হয়েছে, যেখানে তার উপর কঠোর নজরদারি চালানো হচ্ছে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, মোজাফফরকে গ্রেপ্তারের মাধ্যমে এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তে এক বিশাল অগ্রগতি হয়েছে। দীর্ঘদিনের অজানা এই অধ্যায় ও রহস্যের জট আগামী দিনগুলোতে ছিন্নবিচ্ছিন্ন হতে পারে বলে তারা আশা করছেন। তাঁরা বলছেন, যেহেতু মোজাফফর সরাসরি এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত, তাঁর কাছ থেকে সব তথ্য অর্জন জরুরি। তিনি কারা এই ন্ত্য পরিকল্পনা ও নির্দেশনা দিয়েছিলেন, এই হত্যাকাণ্ডের মূল মাস্টারমাইন্ড কারা—সব বিষয়েই তিনি অবহিত। ফলে, তাঁর কাছ থেকে সম্পূর্ণ ও বিশদ তথ্য পাওয়ার আগে তার শাস্তি নিশ্চিত করা উচিত নয়।
সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মোজাফফরকে আগে থেকেই পলাতক ঘোষণা করা হয়েছিল। যেখানেই তার সন্ধান মিলুক, পুলিশ বা আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে তাকে গ্রেপ্তার করতে হবে—এটাই বাংলাদেশ আইনের অংশ। এখন তাকে জিজ্ঞাসাবাদ ও জোড়ালো তদন্তের জন্য জোড় দেওয়া হতে পারে। এর মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত নেপথ্য কারণ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের রহস্যজনক সম্পর্কও উদঘাটিত হতে পারে।
প্রথমে এই মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে অনেক পুরস্কার ঘোষণা ও প্রচার করা হলেও, দীর্ঘদিন ধরে তিনি পলাতক থাকায় তার বিরুদ্ধে কোনো চূড়ান্ত শাস্তি কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো বিদেশি মহল থেকে এই হত্যাকাণ্ডের গোপন নেপথ্য পরিকল্পনার পেছনেও নানা সন্দেহ ও অনুমান প্রকাশ পেয়েছে।
জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর থেকেই মোজাফফর পলাতক ছিলেন। ১৯৮১ সালের চট্টগ্রামে এক সামরিক অভ্যুত্থানে শহীদ জিয়াউর রহমানের মৃত্যু পর অন্য সদস্যরা বনবাসে or গোপন থাকতেন। পরে দীর্ঘ দিন বিভিন্ন চক্র ও দালালের সহায়তায় সীমান্ত পেরিয়ে অজানা দেশে গা ঢাকা দেন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তিনি দেশে ফিরে আসেন। এরপর থেকে ধীরে ধীরে শান্তিপূর্ণভাবে জীবনযাপন করে থাকেন। তিনি কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়াননি, মূলত ঘরের মধ্যেই ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বলছে, সরকার মোজাফফর বিষয়ে কোনো চাপ বা প্রভাব প্রয়োগ করছে না। সেনা আইন অনুযায়ী, তার বিচার হবে বলে প্রত্যাশা প্রশাসনের। তবে বিএনপি ও সংশ্লিষ্ট দলগুলো জানতে আগ্রহী, এই হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড কারা বা কারা এর নির্দেশনা দিয়েছিলেন।
গত বুধবার রাজধানীর একটি বাসায় অভিযান চালিয়ে মোজাফফরকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। এরপর তাকে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। বর্তমানে মামলার তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদ চালু রয়েছে।
মোজাফফরের জীবনে পলাতক থাকার সময়কাল বেশ দীর্ঘ। ১৯৮১ সালে চট্টগ্রামে জিয়া হত্যার পর তিনি আত্মরক্ষার্থে গোপন আত্মগোপন করেন। দীর্ঘ সময় পুলিশ ও গোয়েন্দাদের চোখ এড়িয়ে বিভিন্ন স্থানীয় চক্রের সহায়তায় দেশের সীমান্ত পার হয়ে গোপনে অন্য দেশে চলে যান। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরে তিনি দেশে ফিরে আসেন, তবে ধীর ও নিভৃতে জীবনযাপন করেন। মূলত নিজের ঘরেই থাকতেন, কেউ তাঁর সম্পর্কে অবহিত হতে পারেননি।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, সরকারের এই মামলায় কোনো প্রভাব কিংবা হস্তক্ষেপ নেই। সেনাবাহিনীর আইনই তাকে বিচার করবে। তবে, জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে উঠতে বিএনপি এবং অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর আহ্বান রয়েছে।

