ব্যবসায়ী ও প্রবাসীদের মুঠোফোনে হুমকি দিয়ে লাখ থেকে কোটি টাকা করে চাঁদা আদায় করতেন সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন। এর জন্য তিনি বাহকের মাধ্যমে নগদ টাকা সংগ্রহ করতেন এবং এই টাকা মূলত ঢাকায় অবস্থিত ইউসুফ নামের এক ব্যক্তির কাছে জমা দিতে বলতেন। এরপর সেই টাকা হুন্ডি বা ব্যাংক হিসাবে পাঠানো হতো চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমনের কাছে। পুলিশ ও ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চাঁদাবাজির তথ্য বহু আগে থেকেই সংগৃহীত ছিল। গত বুধবার সকালেই পুলিশ গোপন তথ্যের ভিত্তিতে যশোর থেকে ইমনকে ভারতে পালানোর সময় গ্রেপ্তার করে। ইমন একজন অন্তত ১৫টি মামলার আসামি বলে জানা গেছে। বৃহস্পতিবার তাকে আদালতে হাজির করে কারাগারে পাঠানো হয়। ২০ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে গত সোমবার চট্টগ্রাম দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ডের বড় দিঘিরপাড় এলাকায় ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিনের নির্মাণাধীন ভবনে হামলা ও ভাঙচুর চালায় তার অনুসারীরা। এর আগে ১৩ জুলাই নগরের বাকलিয়া এলাকায় ইমনের বাহিনী ডিডিএন ইন্টারনেট সার্ভিসে হামলা করে। এসব ঘটনায় মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলন করে চাঁদাবাজি বন্ধ ও ইমনের দ্রুত গ্রেপ্তার দাবি জানানো হয়। তবে ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে ইমন বেপরোয়া হয়ে ওঠেন, নানা অপরাধ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন।
পুলিশ বলছে, চাঁদা চাওয়ার আগে তারা বিভিন্ন ব্যক্তির আয়ের উৎস, সম্পদ, নির্মাণাধীন ভবনের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করতেন। পরিবারের সদস্যদের জীবনবৃত্তান্ত পর্যন্ত পরে নেয়া হয়। এরপর নির্দিষ্ট বিদেশি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকে ফোন করে নিরপক্ষ ব্যক্তিদের কাছে চাঁদা দাবি করা হয়, যা কয়েক লাখ থেকে কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। টাকা না দিলে গুলি করে হত্যার হুমকি দেয়া হয়। এমন হুমকি ও টাকাসহ হামলার ঘটনাও ঘটেছে। এক ব্যবসায়ী জানান, প্রথমে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দেয়ার জন্য বলা হয়। এরপর নিরুপায় হয়ে অন্যের মাধ্যমে যোগাযোগ করে ও টাকা দিতে রাজি হন। এমন ঘটনা আরও কমপক্ষে পাঁচজনের সঙ্গে ঘটেছে, যারা সতর্কতাজনক কারণে তাদের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক।
পুলিশের অনুসন্ধানে জানা গেছে, চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় ইমনের লোকজন টাকা সংগ্রহ করে নিয়ে যায় নগরীর জিইসি মোড়ের একটি রেস্টুরেন্টে। সেখানে ইউসুফ নামে এক ব্যক্তিকে টাকা জমা দিতে বলা হয়। পরে তিনি এই টাকা হুন্ডি বা ব্যাংক হিসাবে পাঠান। ইচ্ছে থাকলে ইউসুফই বেশি টাকা সংগ্রহ করে থাকেন। পুলিশ বলছে, ইমনকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য জানা গেছে, তবে তাকে ধরতে আরও অভিযান চালানো হচ্ছে। চট্টগ্রাম অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী মোহাম্মদ তারেক আজিজ বলেন, ইমন নগদে চাঁদার টাকা নিতেন এবং এই টাকা সংগ্রহের জন্য বিশেষ ট্রিগার দল ছিল। তারা বিভিন্ন এলাকা থেকে এসে টাকা সংগ্রহ করে। প্রত্যেকটি দলের কাজ আলাদা—কেউ তথ্য সংগ্রহ করে, কেউ হামলা বা গুলিবর্ষণ করে।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মহোদয় জানান, ইমন রিমান্ডে থাকাকালে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার আশা রয়েছে। ইতিমধ্যে তার কাছ থেকে অস্ত্র জব্দ করা হয়েছে। পুলিশ ও এলাকার মানুষ ভুক্তভোগীদের তথ্য দিয়ে এদের কর্মকাণ্ড বন্ধের জন্য সহযোগিতা করতে আহ্বান জানানো হয়েছে।
ইমন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর এলাকার বাসিন্দা। তাঁর পরিবারে বাবা-মা ও ভাইবোনেরা আছেন। ক্রিকেটে তাঁর আগ্রহ ছিল স্কুলে পড়ার সময় থেকেই। খানিক আগে খেলোয়াড়ি জীবন ছেড়ে তিনি আসেন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। ২০১৪ সালে শুরু হয় তাঁর অপরাধজগৎ। বেশ কিছু বড় সন্ত্রাসী ঘটনায় জড়িয়ে পড়েন তিনি। পুলিশ বলছে, এবছর ১৫টির বেশি মামলা ও অস্ত্রের মালিক তিনি। হত্যাকাণ্ড ও একাধিক অপরাধে তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে। অবৈধ অস্ত্র ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে তিনি দক্ষ। মোবারক হোসেন ইমনের নেতৃত্বে থাকা সন্ত্রাসী বাহিনীর একজন সদস্য তিনি, যেখানে অন্তত ৫০ জন সক্রিয় শুটার ও সহযোগী রয়েছেন। বাদ দিয়ে তার আগে তার দলে ছিলেন সাজ্জাদ হোসেন। তাঁর বিরুদ্ধে দেশে ও বাইরে থাকা নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। এর আগে তিনি ক্রিকেট খেলতেন, কিন্তু বর্তমান এই অপরাধজগৎ তাকে অনেক বড় শত্রু হিসেবে পরিচিত করে তুলেছে, যাঁর বিরুদ্ধে আদালতও বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মূলত, তিনি অস্ত্র, চাঁদা ও গাড়ি ছিনতাইসহ নানা ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়েছেন। পুলিশ বলছে, ইমনের ইচ্ছে ছিল বড় ক্রিকেটার হওয়ার, কিন্তু অন্য সুযোগ পাশ কাটিয়ে তিনি অপরাধের পথে হেঁটে গেলেন। এই পরিস্থিতিতে পুলিশ তাকে পাকড়াও করতে চেষ্টা চালাচ্ছে।

